SHARE

এর আগের পোস্টে আমি সিলভেস্টার স্ট্যালোনের মুষ্টিযুদ্ধের উপরে নির্মিত ছবি “রকি”র উপরে লিখেছিলাম। এখন এ ছবির অভিনেতা এবং ছবি সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য আপনাদের কাছে নিয়ে আসলাম যা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

• প্রথমেই আসা যাক, রকি ছবির নায়ক সিলভেস্টার স্ট্যালোনের কথায়। সিলভেস্টার স্ট্যালোন আজকে হলিউডের একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা কিন্তু এ লোকটি খুব সাধারণ অবস্থা থেকে উঠে এসেছে। তার জীবনটাও বলতে গেলে তার ছবির নায়ক রকির মতোই। স্ট্যালোনের জন্ম নিউইয়র্কের এক গরীব পাড়ায়। এক চ্যারিটি হসপিটালে স্ট্যালোনের জন্ম হয়। তার বাবা ছিলেন ইতালির ইমিগ্র্যান্ট এবং মা একজন বিউটিশিয়ান। জন্মের সময়ে একটি দূর্ঘটনার কারণে স্ট্যালনের মুখের স্নায়ু নষ্ট হয়ে যায় এ কারণে তার ঠোঁটের কিছু অংশ, তার জিহ্বা এবং থুতনি পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়। এ কারণে তিনি ঠোঁট বেকিয়ে কথা বলেন। অভিনেতা হিসেবে এটাই তার ট্রেডমার্ক স্টাইল হয়ে দাঁড়ায়।

• ছাত্র হিসেবে স্ট্যালোন মোটেও ভাল ছিলেন না। তিনি সামাজিক ছিলেন না এবং প্রায়শই মারামারিতে জড়িয়ে পড়তেন। জীবনে তিনি মোট ১৪টি স্কুল পরিবর্তন করেন। পরে তিনি সুইজারল্যাণ্ডের আমেরিকান কলেজ অভ সুইজারল্যাণ্ড থেকে পড়াশুনা করেন।

• প্রথম দিকে অভিনেতা হিসেবে ভাল কিছুই করতে পারছিলেন না। বাসা ভাড়া দিতে না পারার কারণে বাড়িঅয়ালা তাকে বের করে দেয়। এর পরে তিনি কয়েক রাত নিউইয়র্ক এর বাস স্টেশনে ঘুমিয়ে কাটান। টাকার জন্যে বাধ্য হয়ে তিনি The Party at Kitty and Stud’s নামে একটি সফটকোর পর্ণ ফিল্মে অভিনয় করেন। দুই দিন কাজ করে ২০০ ডলার পান।

• এবার আসি রকি ছবির কথায়। জনপ্রিয় জনশ্রুতি হচ্ছে স্ট্যালোনের মাথায় রকি ছবির আইডিয়াটি আসে বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলি এবং চাক ওয়েপনারের ম্যাচ থেকে। কিন্তু পরের দিকে স্ট্যালোন এ কথা অস্বীকার করেন। যাই হোক, এ কথা সত্যি যে ১৯৭৫ সালের ২৪ মার্চ রিখফিল্ড কলোসিয়ামে ওয়েপনার এবং আলির যে ম্যাচ হয় তাতে ওয়েপনারকে আলি পরাজিত করেন কিন্তু পুরো ১৫ রাউন্ড ধরে ম্যাচটি হয় যা কেউ ভাবে নি।

• অন্যদিকে বলা হচ্ছে যে বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা Thomas Rocco Barbella-র আত্মজীবনী Somebody Up There Likes Me থেকেই স্ট্যালোন রকি ছবির আইডিয়া পেয়েছিলেন।

• যাই হোক স্ট্যালোন তিন দিনে টানা ২০ ঘন্টা কাজ করে রকি ছবিটির চিত্রনাট্য (Script) লেখেন। রকি সিরিজের প্রথম পাঁচটি ছবির স্ক্রিপ্ট স্ট্যালোন লিখেছেন এবং তিনি নিজেই নায়ক হয়েছেন।

• স্ক্রিপ্ট লেখার পরে স্ট্যালোন বিভিন্ন স্টুডিয়োর কাছে এটি বিক্রী করার চেষ্টা করেন। তবে শর্ত ছিল যে কেন্দ্রীয় চরিত্রে তিনি নিজে অভিনয় করবেন। কিন্তু কোন স্টুডিয়োই রাজি হচ্ছিল না কারণ স্ট্যালোন কোন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা ছিলেন না। অবশেষে দুজন প্রযোজক Irwin Winkler এবং Robert Chartoff স্ট্যালোনকে স্ক্রিপ্টটির জন্যে সাড়ে তিন লক্ষ ডলার অফার করেন। কিন্তু স্ট্যালোন স্ক্রিপ্টটি তাদের কাছে বিক্রী করেন নি। সাড়ে তিন লক্ষ ডলার স্ট্যালোনের জন্যে তখন অনেক টাকা। তার আর্থিক অবস্থা তখন খুবই খারাপ। ছবিতে কাজ করার জন্যে তিনি প্রতি সপ্তাহে ৩৬ ডলার পান। তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাত্র ১০৬ ডলার ছিল এবং তার পোষা কুকুরটিকে তিনি বিক্রী করার চিন্তা করছিলেন কারণ কুকুরটির খাবার যোগাড় করতে পারছিলেন না তিনি।

• অবশেষে প্রযোজক দুজন রাজী হলেন স্ট্যালোনকে তারা নায়ক হিসেবে রাখবেন তবে শর্ত ছিল যে তিনি বিনা পয়সায় চিত্রনাট্য লিখবেন। প্রথম স্ক্রিপ্টটি তিনদিনে লিখিত হলেও পুরো চিত্রনাট্যটি নয়বার লিখতে হয় প্রযোজকদের মনমতো করতে। মূল চিত্রনাট্যের অনেক কিছুই পরিবর্তন করা হয়।

• রকি ছবিটি খুব কম বাজেটে তৈরি হয়েছে। ছবিটি তৈরি করতে খরচ হয় ১১লক্ষ ডলার। ছবির প্রযোজক উইঙ্কলার এবং চার্টোফ যখন ইউনাইটেড আর্টিস্ট (ইউএ) এর কাছে চিত্রনাট্যটি দেখান ইউএ ছবিটির জন্যে দুই মিলিয়ন ডলার বাজেট ধার্য করে এই ভেবে যে ছবিটিতে হলিউডের তৎকালীন নামীদামী অভিনেতা-রবার্ট রেডফোর্ড, রায়ান ও নীল বা বার্ট রেনল্ডস- এর মতো কেউ অভিনয় করবে। যখন প্রযোজকরা ইউএ কে জানাল যে স্ট্যালোন এ ছবিতে নায়ক হিসেবে থাকবে তখন সাথে সাথে ছবির বাজেট কেটে এক মিলিয়ন ডলারে নামানো হলো এবং এ শর্তও জুড়ে দেয়া হলো যে এ বাজেট অতিক্রম করলে অতিরিক্ত টাকা প্রযোজকদের নিজ পকেট থেকে দিতে হবে। তো পুরো ছবি তৈরি করতে খরচ হয় ১১ লক্ষ ডলার। অতিরিক্ত এক লক্ষ ডলার যোগাড় করবার জন্যে প্রযোজকরা ব্যাঙ্কের কাছে তাদের বাড়ী বন্ধক রাখেন।

• রকি সিরিজের প্রথম ছবি Rocky এর শুটিং হয় ২৮ দিনে। বাজেট কম থাকার কারণে প্রযোজকরা ফিলাডেলফিয়ার অনেক জায়গায় চুরি করে অনুমতি না নিয়ে শুটিং করেন। শ্যুটিং করার সময়ে কোন যন্ত্র ছিল না ছিল না কোন অতিরিক্ত লোক। সোজা বাংলায় বলতে গেলে একদম ফকিরী হালতে ছবির শ্যুটিং করা হয়। রকি ছবিতে দেখা যায় যে রকি ম্যাচ এর আগে দৌড়াচ্ছে নদীর পাশ দিয়ে। পরিচালক জন জি অ্যাভিল্ডসেন নদীর পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাবার সময়ে তার মনে হয়েছিল এখানে শ্যুটিং করলে ভাল হবে। সে স্ট্যালোনকে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়াতে বলল। স্ট্যালোন ঠিক তাই করল।

• বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীকে মাথায় রেখেই অ্যাপলো ক্রিড চরিত্রটি তৈরি করা হয়। ছবিতে মুষ্টিযোদ্ধা অ্যাপলো ক্রিড যে রকিকে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলবার সুযোগ দেয় তার কথা বলার ঢং মোহাম্মদ আলীর মতোই। অভিনেতা Carl Weathers অ্যাপলো ক্রিড এর চরিত্রটি করেন। ছবির শেষে যে যে মুষ্টিযুদ্ধ দেখান হয় সেটার শ্যুটিং করতে গিয়ে স্ট্যালোন এবং ওয়েদার্স দুজনেই আহত হন। ওয়েদার্স নাকে এবং স্ট্যালোন বুকের পাঁজরে আঘাত পান।

• এতক্ষণ স্ট্যালোনের কষ্টের কথা আর রকি ছবি তৈরির করতে গিয়ে কি কি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তার কথা বললাম। এবার আসি সাফল্যের কথায়। রকি ১৯৭৬ এর নভেম্বর নিউইয়র্কে মুক্তি পায়। মাত্র এগার লক্ষ ডলারে নির্মিত এ ছবিটি বিশ্বজুড়ে ২২৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে সে বছরের সবচেয়ে ব্যবসা-সফল ছবি হয় ওঠে।

• শুধু যে ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে তাই নয়। হলিউডের ইতিহাসে ৪৯ তম অস্কার পুরস্কারের দৌড়েও রকি বাজিমাত করে দেয়। অস্কারের ইতিহাসে রকি ছিল The Biggest Upset। ঐ বছরে অস্কারে রকি দশটি ক্যাটেগরিতে নমিনেশন পায়- সেরা ছবি, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা, সেরা অভিনেত্রী, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা সাপোর্টিং অভিনেতা, সেরা ফিল্ম এডিটিং, সেরা মিউজিক এবং সেরা সাউণ্ড মিক্সিং। এর মধ্যে সেরা ছবি, সেরা পরিচালক এবং সেরা ফিল্ম এডিটিং ক্যাটেগরিতে রকি অস্কার জিতে নেয়। সেরা ছবির পুরস্কারের ঘোষণা দিচ্ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা জ্যাক নিকলসন। তিনিও ভাবেন নি যে রকি সেরা ছবির পুরস্কারটি পাবে। “All the President’s Men,” “Network,” “Taxi Driver,” “Bound for Glory” এর মতো ভাল ভাল ছবিকে টেক্কা দিয়ে অস্কার জিতে নেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে স্ট্যালোন এ অনুষ্ঠানে যে স্যুটটি পরে এসেছিলেন সেটা ছিল ভাড়া করা। অনুষ্ঠানে আসার পথে তার বো-টাই পড়ে যায়। যখন জ্যাক নিকলসন সেরা ছবির ঘোষণা দেন তখন ইরউইন উইঙ্কলার এবং রবার্ট চার্টোফ স্ট্যালোনকে একরকম ধরে নিয়ে যান স্টেজে।

ইন্টারনেটে এ ছবি নিয়ে ঘাটতে গিয়ে আমি এসব তথ্য গুলো জানতে পারি। শুধু ছবি হিসেবে নয় রকির নায়ক এবং এ ছবির বানানোটাও একটা বিশাল যুদ্ধের মতো। এ জন্যেই এখনো রকি দেখতে আমার একটুও বোরিং লাগে না।

জীবন আসলেই বিচিত্র এবং জীবনের সাফল্য আরো বিচিত্র। অভিনেতা, লেখক, কবি, চলচ্চিত্রকার যারাই সফল হয়েছেন তারা একসময়ে অনেক কষ্ট করেছেন, অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন কিন্তু তারপরেও তারা হাল ছাড়েন নি ধৈর্য ধরে চেষ্টা করে গিয়েছেন। নিজেদের উপরে বিশ্বাস রেখে গিয়েছেন। এজন্যেই তারা সফল হয়েছেন।
এখানে স্ট্যালোন এবং মোহাম্মদ আলীর একটি ভিডিও দিলাম। তারা দুজনে মিলে ১৯৭৭ সালের অস্কারের সেরা সাপোর্টিং অভিনেত্রীর ঘোষণা দিচ্ছেন। ভিডিওটি দেখে আমার খুব মজা লাগল তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম
সূত্রঃ
www.imdb.com/title/tt0075148/trivia?ref_=tt_trv_trv
www.imdb.com/name/nm0000230/bio?ref_=nm_ov_bio_sm
www.imdb.com/name/nm0000230/bio?ref_=nm_ov_bio_sm
https://en.wikipedia.org/wiki/Rocky
https://en.wikipedia.org/wiki/Chuck_Wepner
https://en.wikipedia.org/wiki/Sylvester_Stallone http://www.washingtonpost.com/wp-dyn/content/article/2007/01/18/AR2007011800650_pf.html

যদি আপনার এই লেখাটি পড়ে ভাল লাগে তবে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপে যোগ দিন ও এ ধরনের অনেক পোস্ট পড়ুন।

Comments

comments