SHARE

আমাদের চারিপাশে হাজারো নিরুদের বাস , সকল নিরুকে নিয়ে লেখাতো আর সম্ভব নয় !!তবে  আজ আপনাদের এই হাজারো নিরুর মাঝে একজন নিরুর জীবনের উত্থান পতন এর গল্প বলবো…

 

আমাদের সমাজের একটি চলমান বাক্য আছে নারী মানেই ঘরের ভিতর থাকা , তাদের ঘরের বাহিরে যেতে নেই , আর যদিও কেউ সেই বাধা অমান্য করে যায় তাহলে তাকে মুখোমুখিহতে  হয় নানান রকম সমস্যার । তার উপর দারিদ্র ঘরে জন্ম নিলেতো কথাই নেই ।

 

নিরু ঠিক এমন ই একজন ,যার জন্ম আধো পাড়া গায়ের এক দারিদ্র পরিবারে। জন্মের পর থেকেই সংসারের অভাব আর সেই অভাবের তাড়নায় পড়া লেখা বন্ধ হয়ে যাওয়া ।না খেয়ে দিন পার করা , পরিবারে লেগে থাকা অসুখ আর বিনা চিকিৎসায় মরে যাওয়া একমাত্র ছোট ভাই । বাবা অন্যের জমিতে দিন মজুর খেটে যা পায় তা দিয়েই কোন ভাবে চলে সংসার । পরিবারে মা -বাবা আর নিরুরা ৪ বোন।৪ বোন এর মধ্যে নিরু সবার ছোট । ৪ মেয়ে হওয়ায় বাবা একটু রাগ , ছোট মেয়ে হওয়ার কারণে কিছুটা আদর পায় সবার কাছ থেকে । কিন্তু আদর দিয়েতো আর পেট ভরে না ? সব সময় বাবা কে বলে একদিন দেখো আমাদের এই অবস্থার পরিবর্তন হবে । সে দিন আমাদের আর কোন দুঃখ থাকবেনা , থাকবেনা কোন অভাব । আমাদের সেই এক বাড়ি হবে । বাবা করিম মিয়া এই সব শুনেও না শুনার ভাব করে থাকে , মাঝে মাঝে বলে ছেলেদের দ্বারা যেটা হয় না , আর তুই কিনা একটা মেয়ে হয়ে করবি বাড়ি । গাছে কাঠাল গোপে তেল । এই সব বাধ দিয়ে সংসারের কাজে তোর মাকে সময় দে, স্বামীর বাড়ি গিয়ে এই সব করতে হবে ।

 

নিরুর গায়ের রং ছিলো কালো , যার জন্য অনেকেই তাকে অন্য চোখে দেখতো , এমনকি অনেকেই সামনা সামনি বলেও দিতো ওই দেখো কালো পেত্নি আসছে । তাতে নিরুর কিছুটা মন খারাপ হলেও সে তার স্বপ্ন নিয়ে ভাবতো সারা দিন । কিভাবে দূর করা যায় পরিবারের এই অভাব । কিভাবে একটু সচ্ছল ভাবে বেচে থাকা যায় । এই ভাবে চলতে থাকে নিরুদের পরিবার , অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই । এই দিকে দারিদ্রতার কারণে বড় বোনের বিয়ে টাও হচ্ছে না , ছেলের বাড়ির লোকেরা যৌতুক হিসাবে ৫০০০০টাকা চায় , যেখানে ৫০টাকা হলে তাদের পরিবারের একদিনের খরচ হয় , সেখানে ৫০০০০ হাজার টাকা ? নিরু বোনদের নিয়ে বসলো তারা নিজেরা কিছু করবে , তবে কি করবে তা এখনও সিদ্ধান্ত নেয় নি ।  কিছুদিন পর নিরু একটি এনজিওর অধীনে সেলাইর কাজ শিখলো । আর তার এই সেলাইর কাজ শিখা নিয়ে গ্রামের অনেকেই হাসা হাসি করা শুরু করলো , অনেকেই বলা শুরু করলো করিমের মেয়ে বড় লোক হবে … এই বলে তাকে ব্যঙ্গ করতে লাগলো ।

করিম মিয়া কাজ থেকে ফিরার সময় কে যেন কি বলেছিলো তাতে তার মাথা খারাপ ,  ঘরে এসেই নিরুকে বকাবকি শুরু করলো আর কোন কাজ নাই ? তোমাকে দর্জি হতে হবে ? আর উনি এই দর্জির কাজ করে কি এমন মহা কান্ড করবে , আমাদের টাকার সাগরে বাসাবে । এই সব বাধ দিয়ে ঘরে বসে থাকো । কোথাও যেতে হবে না ।

নিরু ঠান্ডা মাথায় বাবার কথার জবাব দিলো , বাবা আমরা না খেয় থাকলে আজ যারা তোমায় এমন কথা শুনিয়েছে তাদের কেউ কি খাবার এনে দেয় ? যেহেতু তারা দেয়না , তাহলে আমরা তাদের কথায় কান দিতে যাবো কেন ?

মেয়ের কথা শুনে করিম মিয়া আরু উৎত্তেজিত হয়ে পড়লো । এবংগায়ে হাত তুললো ।

নিরু অনেক কান্না করলো , কারণ এর আগে কোন দিন তার গায়ে কেউ হাত তোলে নাই । নিরুর জিদ আরো বেড়ে গেল ।  সে তার স্বপ্নের পিছনে সময় দিতে লাগলো । কিছুদিন যেতেই নিরু একটা সেলাই মেশিন কিনে ঘরে বসেই সেলাইর কাজ শুরু করে দিলো । এবং তার বাকি বোনদের কেউ সেলাইর কাজ শিখাতে শুরু করলো । নিরুর ইচ্ছে বাজার থেকে কাপড় কিনে সেই কাপড়ে নতুন ডিজাইনের জামা বানিয়ে বাজারে সেল করবে । সেই লক্ষে তার বোনদের কে এক এক জনকে এক দিকে শিখাচ্ছে । ।গ্রামের মোড়ল থেকে টাকা ধার নিয়ে আর কিছু টাকা জমিয়ে  আরো ২ টা মেশিন এবং কিছু  কাপড় কিনে আনলো । ৪ বোন মিলে কেউ কাপড় গুলো কাটছে কেউ সেলাই করছে আর নিরু হাতের কাজ এবং কাপড় গুলোর সকল দিক দেখছে । প্রথম বার বেশ কিছু টাকা লাভ করলো , আর তাতে নিরুর সাহস আরো বেড়ে  গেলো এবং একটু বেশি করে কাপড় কিনে আনলো ।সমস্যাটা এইবার হলো , নিরু যে দোকান গুলোতে তার তৈরি করা জামা গুলো বিক্রয় করে সেই দোকান দার গন তার টাকা গুলো আটকি য়ে দিলো । অনেকের কাছেই গিয়েছে কিন্তু কোন আশানুরূপ ফল আসে নি । সবাই ফিরিয়ে দিয়েছে , সবার একটাই কথা এই মেয়ে মিথ্যা বলছে । সবাই নিরুর বিপক্ষে যাওয়ার একটা কারণ ছিল যে নিরু গরীব আর ওরা অনেক টাকার মালিক । এতে করে নিরু আবার হতাশায় পড়ে গেলো এখন কি করবে ? কিছুদিন বিরতীর পর নিরু আবার নতুন করে শুরু করার সিদ্ধান্ত করলো । কিন্তু তাতে নিরুর বাকি ৩ বোন রাজি হলো না । তাতে কি নিরু থেমে থাকার লোক নয় ।তাই সে নিজেই চেষ্টা চালিয়ে গেলো , দিন রাত পরিশ্রম করা শুরু করলো ।এবং এইবারেরতৈরি করা জামা আর সে তাদের স্থানী বাজারে বিক্রয় না করে , শহরেরর উদ্দেশ্যে নিয়ে আসলো , এবং কিছু দোকানিকে দেখানোর পর তারা তার তৈরি পোশাক গুলো পচন্দ করলো ।এবং তার কাজের প্রশংসা ও করলো । সব চেয়ে বড় ব্যাপার ঘটলো নিরুর টার্গেটের বাহিরে চলে গেলো দাম । মানে সে যেই দাম আশা করেছিলো তার থেকেও বেশি টাকা বিক্রয় হয়েছে । এবং ৩ জন দোকানদার তাকে কিছু অ্যাডভান্স দিয়ে আরো নতুন কিছ পোষাকের অর্ডার করলো ।শুরু হলো নিরুর নতুন জীবন ।  সে বাড়ি এসে বোন দের সাথে এই বিষয়ে বসলো এবং পনুরায় সবাই মিলে কাজ শুরু করলো । একটা সময় নিরু তার সেই স্বপ্নের জীবন উপভোগ করতে লাগলো । আজ আর তাদের অভাব নেই নেই কোন ক্ষুদার আর্তনাধ ।  তৈরি করা হলো নিরুর সেই স্বপ্নের বাড়ি ।

 

 

আসলে কি জীবনে সফলতা অর্জনের জন্য গায়ের রং , সাইজ , এমন কি মোটা অংকের টাকার প্রয়োজন নেই ,যদি আপনার সৎ সাহস , একটি সুন্দর স্বপ্ন  এবং কঠোর পরিশ্রম করার মন মানসিকতা । আর তাহলেই আপনার জীবনে সফলতা নামক সেই সোনার হরিণের দেখা মিলবে ।

লেখাটা অনেক দিন আগে থেকেই লিখবো ভাবছিলাম , কিন্তু ব্যাস্তার কারণে হযে ওঠা হয়নি , আর মূল কথা গল্পটাকে আমি ছোট করে লিখেছি ।

ছবি সূত্রঃ www.pageresource.com

যদি আপনার এই লেখাটি পড়ে ভাল লাগে তবে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপে যোগ দিন ও এ ধরনের অনেক পোস্ট পড়ুন।

Comments

comments