একজন ওয়ালী উল্যাহর ভিক্ষে ছেড়ে সুন্দর জীবনে ফেরার গল্প

একজন ওয়ালী উল্যাহর ভিক্ষে ছেড়ে সুন্দর জীবনে ফেরার গল্প

1324
0
SHARE

লেখকঃ জাহাঙ্গীর আলম শোভন

তখন আমি বোকাসোকা ছেলের তকমা ছেড়ে, একটু চটপটে, ডানপিঠে এবং দূরন্ত হয়ে উঠেছি। কখনো কখনো ছেলের দলের সর্দারী করতে শুরু করেছি। বলছি ক্লাস ফোরের কথা। একদিন আমাদের বাড়ীতে এ ভিক্ষুক এলো। বয়স অনুমান করা কঠিন। তবে ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায় ৩০ এর বেশী হবে, 32ও হতে পারে । ঘনকালো লম্বা দাড়ি, ময়লা জামা, জবুথবু চেহারা, হাতে লাঠি, একটু অবনত চলাফেরা ফলে চট করে কেউ খেয়াল করে না। কেউ হয়তো দু/একবার বলে, ‘‘জোয়ান মানুষ কাজ করে খেতে পারো না’’। কিন্তু কেউ কাউন্সেলিং করে না।

আমি তখন ‘‘ক্লাস ফোর- হেড মাস্টারের জুতা চোর’’ শীতের শুকনো মাঠে সে ভিক্ষুক নামটা আমার এখনো মনে আছে ‘‘ওয়ালী উল্যাহ’’ তাকে নিয়ে বসলাম। তখন প্রথমে তার জীবনের গল্প শুনলাম। কেন ভিক্ষে করে এসব জানলাম। সে লোক পাশের জেলার নদীভাঙ্গা, কোনো উপায় না পেয়ে এ কাজ করছে, এসব নানা কথা বলল। তারপর জানতে চাইলাম মাসে কত ইনকাম হয়। তারপর লোকটা কি কাজ জানে? তার বৌ কি কাজ জানে? ছেলেমেয়ে কতজন এসব জানলাম। তাকে হিসেব করে বোঝালাম। যেহেতু তার স্ত্রী হাতের কাজ জানে, সে লোকটিও কিছু জানে তাহলে যদি বাঁশের বা বেতের কাজ এবং শীতল পাটি বানালে তার ভিক্ষের চেয়ে বেশী রোজগার হবে। এবং সেটা হবে সম্মানের।
দুষ্টু ছেলেদের ৭/৮ জনকে নিয়ে তাকে প্রায় ৩ ঘন্টা কাউন্সেলিং করলাম। গোধুলী লগ্নে, সন্ধ্যার আগে, বিদায় মুহুর্তে মোহাম্মদ ওয়ালী উল্যাহ আমাদের কথা দিলো, এই মাস তার শেষ ভিক্ষার মাস। পরের মাস থেকে সে ভিক্ষা ছেড়ে দিয়ে সেল্প এম্লয়মেন্ট শুরু করবে। তাকে কনভিন্স করতে পেরে ক্লাস ফোরের এক দুষ্টু বালককের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো। আর লোকটা ফিরে গেলো নতুন জীবনের সন্ধানে।

যথারীতি ভূলে গিয়েছিলাম। ঠিক বছর খানেক পরে ডাকযোগে আমার ঠিকানায় একটা চিঠি আসলো। ক্লাস ফাইভের ছেলের নামে চিঠি সবাইকে ঘাবড়ে দিলো।আমি নিজেও অবাক হলাম।

জনাব ওয়ালী উল্যাহ লিখেছেন তিনি স্বাভাবিক জীবন শুরু করেছেন। তার ৭ বছরের ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন যাতে সে আমার মতো হতে পারে। তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন- আমি যেন অনেক বড়ো হই। চিঠিটা সর্বশেষ ইন্টারমিডেয়েট পড়ার সময়ও আমার কাছে ছিলো, পরে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি।
আমি হয়তো অনেক বড়ো হতে পারিনি। কিন্তু ওয়ালী উল্যাহ সাহেবকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে ফিরেছেন এটা আমার কাছে অনেক পাওয়া। নিজেও ইন্সাপায়ার্ড হলাম, একজন হতাশাগ্রস্থ ভিক্ষুক যদি আমার উৎসাহে জীবনে ফিরতে পারে- সমাজের জন্যতো আমরা অনেকভাবেই কাজ করতে পারি। তারপর থেকে সামাজিক কাজে জীবনের অসংখ্য দিন ব্যয় করেছি। এখনো করি- এসবের মাঝে নিজের পাওয়া না পাওয়ার কথা বলতে গেলে মনেই থাকে না।

এর পরে আরো অনেক ভিক্ষুককে কাউন্সেলিং করেছি। কিন্তু সেই ওয়ালী উল্যাহর কথা, তার চেহারা, তার ভাব সবই আমার মনে আছে।

এটা আমার ক্লাস ফাইভের ছবি, যখন থেকে মানুষকে উৎসাহ দিয়ে নিজেকেও জাগাতে শিখেছি।

শিখলাম: অন্যকে উৎসাহ দিলে নিজেকেও জাগিয়ে তোলা যায়

Comments

comments