স্বপ্ন বাণী

স্বপ্ন বাণী

2306
0
SHARE

বেশ কয়েকদিন যাবৎ নিখিলের মন ভালো যাচ্ছে না । চারদিক শুধু না পাওয়ার আর্তনাদ আর হাহাকার । জীবন কে আজ বোঝা মনে হচ্ছে মনে হচ্ছে এই বোঝা টানা আর সম্ভব না । কি করবে কিভাবে করবে তার কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না । মনে হচ্ছে এইবার এই জীবন থেকে মুক্তি পেলেই সে বাচে । যে জীবনে সুখের দেখা মেলে না যে জীবনে একটি দিন ও সে শান্তির ঘুম দিতে পারেনি , এমন জীবন রেখে আর কি লাভ ? আর বেচে থেকতো কিছু করতে পারে নাই তার পরিবারের জন্য । সে না থাকলে তার পরিবারে কোন ক্ষতি নেই বরং লাভ ই আছে , কারণ তার বরণ পোষণের পিছে যে খরচ টা হয় অন্তোত তাতো হবে না ?

ছোট বোন আর নিখিল , বাবা মিজান সাহেব আগে একটা কোম্পানিতে চাকুরি করতো , মা সংসারের দেখা শুনা করতো । বাবাই ছিলো পরিবারের একমাত্র উপার্জন কারী । নিখিল মাস্টার্স শেষ করে বেকার চাকুরির জন্য চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে কিন্তু মামা খালূর জোর না থাকায় তা হচ্ছে না । ব্যবসার চেষ্টাও করেছে অনেকবার কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ । দুর্ঘটনায় এক পা হারিয়ে মিজান সাহেব ঘরে বসে পড়েছেন । চাকুরির সময় কিছু টাকা জমিয়েছিলো এখন সেই টাকা থেকেই অল্প অল্প করে রেবেকা বেগম ( মানে নিখিল এর মা ) কোন ভাবে সংসার চালাচ্ছে । টাকার অভাবে ছোট বোন টুম্পার পড়ালেখাও বন্ধ প্রায় । এ্ অবস্থায় পরিবারের সব দায়িত্ব নিখিলের । কিন্তু কি করবে সে কিছুই তো করতে পারছে না , না চাকুরি না ব্যবসা । আর প্রতিদিন মিথ্যা আশ্বাস দিতেও আর মন চাইছে না । মনে হচ্ছে সব দরজা বন্ধ এখন মরে যাওয়াই শ্রেয়ো ।

***

উচু পাহাড়ের চুড়ায় বসে  নিখিল ফেলে আসা দিন গুলো নিয়ে ভাবছে , অনেক আশা করে তাকে পড়ানো হয়েছে নামী কলেজে । যাতে পড়া শেষ করেই সংসারের হাল ধরতে পারে । কিন্তু পড়ালেখা শেষ আজ পাঁচ বছর কিন্তু কিছুই করতে পারলো না । পরিবারের জন্য । যে পরিবার তাকে এতো কষ্টো করে তাকে বড় করেছে কিন্তু সে কি দিলো তার বিনিময়ে ? এই সব চিন্তা করতে করতে নিখিল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো তার জীবনের ইতি টেনে নিবে । আজকেই শেষ । দু হাত প্রসারিত করে চিৎকার করে বলতে শুরু করলো গুড বাই পৃথিবী গুড বাই । এই বলে পাহাড়ের চুড়া থেকে লাপ দিবে ঠিক এমন সময় কেউ একজন পিছন থেকে নিখিল এর জামা টেনে ধরলো । এই যাত্রায় আর হলো না । নিখিল খুব রাগান্বিত হয়ে পিছে ফিরলো , মন চাইলো তাকে কয়টা মারে । কিন্তু নিখিল এর হাত আটকে গেলো । নিখিল এইটা কি দেখছে স্বপ্ন না সত্যি , এটা কখনই সম্ভব না । কারণ এই অধ্যার অনেক আগেই ইতি হয়ে গিয়েছিলো । কিন্তু আজ আবার নতুন করে ? নাকি তাদের চেহারার মিল আছে ? নিখিল বুঝে উঠতে পারছে না । সে কি দেখছে , এটা কিভাবে সম্ভব ?

 

নিখিলের সামনে দাড়িয়ে আছে স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন এবং তাকে যে টেনে ধরেছে তিনি হলেন আব্রাহাম লিংকন  । দুজনেই নিখিল এর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে কিছুই বলছে না । নিখিল কিছুই বুঝে উঠার আগে আইনস্টাইন তাকে পশ্ন করলো তুমি মরতে চাও কেন ? তোমার দুঃখগুলো কি তোমার জীবনের থেকেও ভারী হয়ে গেছে ? তুমি কি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাড়িয়েছো ? তোমার মৃত্যুতে কি তোমার সকল সমস্যার সামাধান হবে ? হ্যাঁ যদি হয় তাহলে যেতে পারো , আমরা বাধা দিবো না ।

নিখিল কিছুই বললো না , কারণ এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর তার জানা নেই , আর তাছাড়া উনাদের মতো মানুষের সামনে দাড়িয়ে কথা বলার সাহস নিখিল হারিয়ে পেলেছে । আজ তাকে অপরাধী মনে হচ্ছে । নিখিল তার জীবনের সকল কিছু খুলে বললো । আইনস্টাইন এবং আব্রাহাম লিংকন দুজনেই শুনলেন ।

এসো এইদিকে এসো , যেথায় বিপদের শংকা থাকে তার থেকে একটু দুরে থাকাটাই ভালো , এই বলে নিখিলকে টেনে নিয়ে গেলো একটা সবুজ রং এর বাংলোতে । বেশ সুন্দর দেখতে সামনে ফুলের বাগান, বাগানে ফুটে আছে বাহারি প্রজাতির ফুল । ভিতরটাও বেশ সুন্দর মন জুড়িয়ে যাবার মতো একটি বাড়ি । তিন জনে সোফার উপর বসলো ।

আইনস্টাইন নিখিলকে উদ্দেশ্য করে বললো দেখো তুমি এতো দুর পড়া লেখা করেছো আর এইটুকু জ্ঞান তোমার নেই ? যে পরাজয় মানেই থেমে যাওয়া নয় যাত্রা একটু ধীর হওয়া মাত্র ।

নিখিল : স্যার , আমি প্রচুর পরিমাণে চিন্তায় পড়ে গেছি ? অনেক চেষ্টার করেছি কিন্তু কিছু হয়নি , কিছুই করতে পারিনি , আর তাই জীবনটাকে বোঝা মনে হতে লাগলো ।

আইনস্টাইন : তোমার মৃত্যুতে কি তোমার পরিবার সুখী হতো ? না ! তারা আরো ভেঙ্গে পড়তো , ধংস হয়ে যেতো তাদের পৃথিবী । তুমি তাদের চেয়েও বেশি হেরে গেছো যারা তোমার আগে সফলতার পিছে ছুটেছে ? তুমি কি এমন কষ্টই পেয়েছো যাতে তোমার বেচে থাকার সাধই মিটে গেলো ? দেখো এই গুলো তোমার বোকামি এর বাহিরে কিছুই বলবো না । আচ্ছা তোমায় একটা প্রশ্ন করি . তুমি কি তোমার পাঠ্যপুস্তুক এর বাহিরে কারো জীবনি কিংবা কোন নোবেল পড়েছো ?

নিখিল : পড়েছি তেমন বেশি নয় ।

আইনস্টাইন : সমস্যাটা এইখানেই , আজ যদি তুমি পড়তে তাহলে জানতে সফলতাটা কেমন , তাহলে তোমার সেই সফলতার প্রতি এক ধরণের লোভ জন্ম নিতো , আর সফলতার আগে তোমার যে বাধা গুলো আসতো সেই সর্ম্পকেও কিছুটা ধারণা পেতে । তুমি কি মনে করো যারা আজ পৃথিবীতে মহান ব্যাক্তি হিসেবে পরিচিত, তারা কি সহজেই এই মহানত্ব লাভ করেছে ? না জীবনটা এমন নয় ? এইযে দেখ ( আব্রাহাম লিংকন কে দেখিয়ে ) তোমার সামনে যে বসে আছে যারা জয় ধ্বনি শুনছো গোটা পৃথিবী জুড়ে তার জীবনের সর্ম্পকে কিছু জানো  ?

নিখিল : না , তেমন বেশি জানি না । তবে এইটুকু জানি তিনি একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ।

আইনস্টাইন : হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছো ওনি মার্কিন যুক্তরাষ্টের ১৬ তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন । আজ ওনার এই জয় গান এমনিতে প্রকাশ পায়নি । এর জন্য অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে, তোমার বয়স এখন ২৫ তুমি তো মাত্র একটা চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছো , তবে যদিও এইটাকে আমি ব্যর্থতা বলিনা । যাই হোক । কিন্তু উনি জীবনের অকেটা পথ হারতে হারতে আজকের উনিতে রূপান্তর হয়েছেন । ২১বছর বয়সে একবার তিনি ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হন, ২২বছর বয়সে আইন সভার নির্বাচনে পরাস্ত হন। ২৪ বছর বয়সে আবার ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২৬ বছর বয়সে তার প্রিয়তমা মারা যান। ৩৪বছর বয়সে কংগ্রেস নির্বাচনে পূণরায় পরাস্ত হন। ৪৫বছর বয়সে সাধারণ নির্বাচনে হেরে যান। ৪৭বছর বয়সে ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রবল আকাঙ্খা নিয়ে নির্বাচনে ফেল করেন। ৪৯বছর বয়সে আবার সিনেটের নির্বাচনে হেরে যান। অবশেষে ৫২বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। এই ব্যর্থ ব্যক্তিটির নাম আব্রাহাম লিঙ্কন। আর তিনিই আজ তোমার সামনে বসে আছে ।

নিখন এর মুখে কোন কথা নেই । কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না । এমন সময় আব্রাহাম লিংকন বলে উঠলেন আসলে কি জানো তোমরা যারা আছো , তারা অল্পতেই অনেকটা ভেঙ্গে পড়ো । আর আমার মতে তোমাদের কোন স্বপ্নেই নেই । কারণ স্বপ্ন হতে হবে বাশের কন্ঝির মতো যাতে হতাশা নমক ঝড়ে একটু নুয়ে যায় তবে ভেঙ্গে না পড়ে । স্বপ্ন হতে হবে এমন যা তোমাকে সারাক্ষণ দৌড়ের উপর রাখবে । সে থাকবে তোমার চিন্তায়, তোমার চেতনায় মোট কথা তোমার পৃথিবী জুড়ে । তাহলে সেটা স্বপ্ন , যাকে তুমি অনেক ভালোবাসবে , ঠিক একটি মেয়ে কিংবা একটি ছেলে যেমন অন্য একটি ছেলে কিংবা মেয়েকে ভালোবাসে এবং তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে , সব কিছু্তেই রাজি হয়ে যায় । যদি তুমি এমন স্বপ্ন দেখতে পারো তাহলেই তোমার স্বপ্ন সত্যি হবে ।

সুতরাং ২ দিন একটু বিশ্রাম নাও এবং তোমার ফেলে আসা দিন গুলোকে মনে করার চেষ্টা করো , সেখান থেকে কোন কাজটিতে তুমি কিছুটা সস্তিবোধ করেছিলে তাকে নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করো , দেখবে তুমার বিজয় হবেই । ভালো থেকো , এগিয়ে চলো স্বপ্নের পথে ।

হঠাৎ করে লাপিয়ে উঠলো নিখিল , তার শরীর দিয়ে আষাড়ের বৃষ্টির মতো ঘাম ঝরছে , অথচো এখন শীত কাল তার উপর পাখাটাও খুব জোরে চলছে , কিছুতেই নিখিল এর শরীর এর তাপমাত্রা কমছে না । এই সব কি দেখলো , তবে কি উনারা নিখিলকে পথ দেখাতে এসেছিলো স্বপ্নে ? হতে পারে , রাতে আর নিখিল এর ঘুম হয়নি , স্বপ্নের কথা গুলো নোট করে রাখলো , এবং ভাবতে শুরু করলো কিভাবে কি করবে , স্বপ্নের বাণী অনুযায়ী সে তার পিচনের দিক গুলো নিয়ে বসে পড়লো , এবং ওখান থেকেই তার জীবনের জন্য একটা পথ বেচে নিলো । …………………

অন্য দিন আসবো নিখিল এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে , কেমন আছে এখন নিখিল সেই বিষয় নিয়ে , সেই পর্যন্ত ভালো থাকবেন ,সুস্থ থাকবেন । এই কমনায় শেষ করছি ।

ওহ হ্যাঁ আপনার মতামত দিতে বুলবেন না কিন্তু । আপনার মতামতের অপেক্ষায়  রইলাম ।

Comments

comments