SHARE

যদি হলিউডের সর্বকালের সেরা ছবির তালিকা তৈরি করা হয় তার মধ্যে যে ছবিটির নাম অবশ্যই উঠে আসবে তা হলো “দ্যা সাউন্ড অভ মিউজিক।” খুবই সুন্দর একটি ছবি। যারা দেখেন নি তারা দেখে নিতে পারেন। সত্যিকার অর্থেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করা যায় এমন একটি ছবি। আমার আজকের লেখা এ ছবিটিকে নিয়ে নয়। যাদের উপর নির্ভর করে এ ছবিটি তৈরি করা হয়েছে তাদের নিয়েই এ লেখা।1 TSoM

Source: Croatia.org

মানুষের জীবন সিনেমার চেয়েও বিচিত্র। জীবন সবসময় একই গতিতে চলে না। জীবনের উত্থান পতন মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় তা বলা যায় না। আজ যে ধনী কাল সে সব হারিয়ে ভবঘুরে হয়ে যেতে পারে। এ কথাটা ফালতু প্যাচালের মতো শোনালেও এ কাহিনীতে সত্যি সেটাই ঘটেছে। কিন্তু মানুষ লড়াই করে বেঁচে থাকে এবং নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য গড়ে নেয়। জীবনে উত্থান-পতন আছে কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

দ্যা সাউন্ড অভ মিউজিক” ছবিটি একটি গায়ক পরিবারের উপরে নির্মিত। ভন ট্র্যাপ পরিবারের সদস্যরা মিলে একটি গানের গ্রুপ গড়ে তোলে এবং তারা বিভিন্ন জায়গায় সঙ্গীত পরিবেশন করে বেড়ায়। এ পরিবারের কর্ত্রী মারিয়া অগাস্টা ভন ট্র্যাপ ১৯৪৯ সালে তার পরিবারের উপরে একটি বই প্রকাশ করেন “The Story of the Trapp Family Singers”।  এ বইয়ের উপরেই ভিত্তি করে “দ্যা সাউন্ড অভ মিউজিক” ছবিটি নির্মিত হয়। আমার এ পোস্ট ভন ট্র্যাপ পরিবার এবং তাদের উত্থান-পতন নিয়েই।

2trapp

এ কাহিনীর নায়ক গেওর্গ জোহান্নেস রিট্টার ভন ট্র্যাপ সব দিক থেকেই সফল একজন মানুষ।  অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির এক বনেদি পরিবারের সন্তান। ১৮৬৭ সালে অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরির রাজবংশ মিলে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের সৃষ্টি করে। ১৯১৮ পর্যন্ত এ সাম্রাজ্য টিকে ছিল।প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে এ সাম্রাজ্য ভেঙ্গে বর্তমানে অস্ট্রিয়া, পোল্যাণ্ড, হাঙ্গেরি সহ আরো বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। গেওর্গ ভন ট্র্যাপ ইম্পেরিয়াল অ্যাণ্ড রয়্যাল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান নেভির খুবই সফল একজন অফিসার ছিলেন। ১৯১১ সালে গেওর্গ বিখ্যাত ইংলিশ ইঞ্জিনিয়ার এবং আধুনিক টর্পেডোর আবিস্কারক রবার্ট হোয়াইট হেড এর নাতনী আগাথা হোয়াইট হেডকে বিয়ে করেন। পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সূত্র আগাথা ভাল সম্পত্তি ও টাকা-পয়সা পান। আগাথা এবং গেওর্গ একে অন্যকে খুবই ভালবাসতেন। তাদের দুই ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে ছিল।

3kids1

Source: Plymouth State University

১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার সাথে সাথে ভন ট্র্যাপ পরিবারের দূর্দিনের সূচনা হয়। প্রথমে  পরাজিত হয়ে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায় এবং তাদের নৌ-বাহিনীকেও বিলুপ্ত করে দেয়া হয়। এর চার বছর পরে ১৯২২ সালে আগাথা স্কার্লেট ফিভারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নৌ-বাহিনীর বিলুপ্তি এবং স্ত্রীর মৃত্যুতে গেওর্গ ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়েন। নৌ-বাহিনী ছিল গেওর্গের জীবন। এর বাইরে তিনি কোন কিছুই ভাবতে পারতেন না। নৌ-বাহিনীর চাকরি শেষ হয়ে যাবার পরে আর কোন কাজে তিনি মন দিতে পারেন নি।

4 Villa Trapp

Source: Villa Trapp.com

স্ত্রীর মৃত্যুর পরে গেওর্গ স্যালজবুর্গের একটি বাড়িতে (উপরের ছবিতে) এসে বসবাস করতে থাকেন। বাড়ীর অবস্থা দেখেই বুঝতে পারছেন যে তাদের আর্থিক অবস্থা ভালই ছিল। বড় বাড়ী চাকর-বাকর টাকা পয়সা কোন কিছুরই অভাব ছিল না।

5 Maria Von Trapp

এ কাহিনীর নায়িকা মারিয়া অগাস্টা কুচেরা ১৯২৬ সালে গেওর্গের এক মেয়ের শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হন। মারিয়া চার্চের একজন স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন এবং তিনি নান হবার দীক্ষা নিচ্ছিলেন।“দ্যা সাউন্ড অভ মিউজিক” ছবিতে দেখান হয় যে মারিয়া গেওর্গ ভন ট্র্যাপ এর বাড়িতে যান এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার সন্তানদের আপন করে নেন। এক পর্যায়ে গেওর্গ ভন ট্র্যাপ ও মারিয়া একে অন্যের প্রেমে পড়ে যায় এবং বিয়ে করেন।

6 wedding

কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি। গেওর্গের সন্তানদের সাথে মারিয়ার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। এটি লক্ষ্য করেই গেওর্গ ১৯২৭ সালে মারিয়াকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। গেওর্গের বয়স তখন ৪৭ এবং মারিয়া ২২ বছরের এক তরুণী। তাদের মধ্যে কোন প্রেম-ভালবাসা কিছুই ছিল না। গেওর্গের প্রস্তাবে মারিয়া ভয় পেয়ে চার্চে ফিরে যান। চার্চের প্রধান তখন মারিয়াকে এ বিয়ে করার অনুমতি দেন। সেই অনুযায়ী মারিয়া তখন গেওর্গকে বিয়ে করেন। মারিয়া নিজেই পরে তার বইতে লিখেছেন, “গেওর্গকে আমি ভালবাসিনি কখনো। আমি তার সন্তানদের ভালবেসে ফেলেছিলাম। এক অর্থে বলতে গেলে আমি গেওর্গকে নয় তার সন্তানদের ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম।” বিয়ের পরে মারিয়ার নাম হয়ে গেল মারিয়া ভন ট্র্যাপ।

7jlie-large

Source: BBC

“দ্যা সাউন্ড অভ মিউজিক” ছবিতে অভিনেত্রী জুলি অ্যান্ড্রুজ মারিয়া ভন ট্র্যাপ এর চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবির মারিয়া খুব চমৎকার সহজ-সরল মনের একজন মেয়ে হিসেবে যে সবাইকে ভালবাসে, কাছে টানে, এবং তার হাসি আর সুন্দর ব্যবহার ভন ট্র্যাপ এর সন্তানদের মন জয় করে নেয়।

8SoundofMusic

Source: Blu-ray Definition.com

ক্যাপটেন ভন ট্র্যাপ এর চরিত্রে অভিনয় করেন আরেক বিখ্যাত অভিনেতা ক্রিস্টোফার প্লামার। ছবিতে দেখান হয় যে, ক্যাপ্টেন ভন ট্র্যাপ কঠোর মনের হৃদয়হীন একজন মানুষ। তার সন্তানরা তাঁর কাছে আসতে ভয় পেত। তিনি তাদেরকে সবসময়ে শাসনের উপরে রাখতেন।

কিন্তু বাস্তব ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বাস্তবের মারিয়া ভন ট্র্যাপ খুবই রাগী এবং একরোখা স্বভাবের। হঠাৎ করেই তিনি রেগে যেতেন। একই সাথে মারিয়া খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিলেন। একবার যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে তিনি কিছু করবেন তাহলে সেটা করেই ছাড়বেন। গেওর্গের সন্তানরা মারিয়াকে পছন্দ করত ঠিকই কিন্তু তাদের মায়ের জায়গায় তারা মারিয়াকে মেনে নিতে পারে নি। অন্যদিকে গেওর্গ ভন ট্র্যাপ ছিলেন খুবই ধীর স্থির এবং শান্ত মনের মানুষ। সন্তানদের তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। তিনি ছিলেন একজন সঙ্গীতপ্রেমী। গেওর্গকে প্রথম দিকে স্বামী হিসেবে পছন্দ না হলেও আস্তে আস্তে মারিয়া তাকে ভালবেসে ফেলেন। মারিয়া হুটহাট করে রাগের মাথায় কান্ড করে বসতেন এবং গেওর্গ ধৈর্য ধরে মারিয়াকে সামাল দিতেন। গেওর্গ মারিয়ার জন্যে এক বিশাল আশ্রয় হয়ে ওঠে। গেওর্গ এবং মারিয়ার তিনটি সন্তান হয়- দুই মেয়ে ও এক ছেলে।

9rrapp_f

Source: The Brunei Times

কিন্তু মায়ের মৃত্যু, সৎ মা এখানেই দুর্ভাগ্য থেমে থাকেনি ভন ট্র্যাপ পরিবারের। ১৯৩০ এর দশকে বিশ্বব্যাপী মন্দা হয় এবং তখন অস্ট্রিয়ার ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়ে যায়। গেওর্গের প্রথম স্ত্রীর অর্থ এ ব্যাঙ্কে জমা ছিল। এ অর্থ হারিয়ে ভন ট্র্যাপ পরিবারের করুণ দশা হয়। তাদের সব চাকর-বাকর বিদায় দেয়া হয়। পরিবারের বয়স্ক ছেলেমেয়েরা মিলে ঘরের কাজ করত। একই সাথে তাদের বাড়ীতে রুম ভাড়া দেয়া শুরু করল। কিন্তু তা দিয়ে যা আয় হতো তা যথেষ্ট ছিল না। মারিয়া তখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে, পরিবারের বাচ্চাদের নিয়ে একটি গানের গ্রুপ চালু করবেন এবং বিভিন্ন স্থানীয় অনুষ্ঠানে গান গাইবেন। গেওর্গের জন্যে এটা ছিল খুবই অপমানজনক। কারণ এতে তার সামাজিক অবস্থান নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। ততদিনে মারিয়া দুইটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। মোট নয়টি ছেলেমেয়ের ভরণপোষণ বিশাল খরচ।

১৯৩৮ সালে নাৎসি জার্মানী অস্ট্রিয়া দখল করার পরে ভন ট্র্যাপ পরিবারের দূর্দশা চরমে পৌছাল। জার্মান নেভি তখন গেওর্গ ভন ট্র্যাপকে চাপ দিচ্ছিল তাদের নৌ-বাহিনীতে যোগ দেবার জন্যে। কারণ তিনি ছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় নৌ-বাহিনীর সবচেয়ে সফল ইউ-বোট ক্যাপ্টেনদের একজন। তাদের বড় ছেলে রুপার্টকে চিকিৎসক এর পদ দেবার প্রস্তাব দেয় নাৎসি সরকার। শুধু তাই নয়, অ্যাডলফ হিটলারের জন্মদিনে হিটলার ভন ট্র্যাপ পরিবারকে দাওয়াত দিয়েছিলেন তার সামনে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্যে। কিন্তু গেওর্গ ভন ট্র্যাপ ব্যক্তিগত ভাবে নাৎসিদের অপছন্দ করতেন। তিনি তার বাড়ীতে নাৎসি পতাকাও ওড়াতেন না। নাৎসিদের ক্রমাগত চাপে এক পর্যায়ে গেওর্গ সিদ্ধান্ত নিলেন যে তারা যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাবেন।

10trapp4_640

“দ্যা সাউন্ড অভ মিউজিক” ছবির শেষে দেখান হয় যে ভন ট্র্যাপ পরিবার তাদের বাসভবন ছেড়ে আল্পস পর্বত পেরিয়া অস্ট্রিয়া থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি। ১৯৩৮ সালের আগস্টে ভন ট্র্যাপ পরিবার তাদের সবকিছু পিছনে ফেলে রেখে চিরকালের মতো অস্ট্রিয়া ছেড়ে চলে যায়। তারা ট্রেনে করে প্রথমে ইতালি এবং পরে লন্ডনে পৌছায় এবং ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বারের মতো গান গাইবার প্রস্তাব পায়।

জীবন আসলেই বড়ই বিচিত্র। একজন সফল মানুষ কিভাবে তাঁর পেশা, স্ত্রী, সম্পদ হারিয়ে সর্বস্বান্ত হলেন এবং সবশেষে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেন। “দ্যা সাউন্ড অভ মিউজিক” ছবিটিতে ভন ট্র্যাপ পরিবারের আনন্দ, ভালবাসাকে দেখান হয়েছে কিন্তু তাদের যন্ত্রণা, কষ্ট দেখান হয় নি। বিদেশের মাটিতে গিয়ে শুরু হয় ভন ট্র্যাপ পরিবারের বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম। সেটা নিয়ে আরেকটি পোস্টে লিখব। আজকে এখানেই শেষ করছি। ধৈর্য ধরে পড়বার জন্যে ধন্যবাদ।

লেখকঃ এস এম মেহদি হাসান

সূত্রঃ

ন্যাশনাল আর্কাইভস

উইকিপিডিয়া (১)

উইকিপিডিয়া (২)

ইস্ট্রিয়ানেট

Comments

comments