SHARE

আপনারা উত্তম কুমার আর শর্মিলা ঠাকুরের আনন্দ আশ্রম ছবিটি দেখেছেন? আমার অনেক প্রিয় ছবি এটি। ছবিতে দেখান হয় যে, উত্তম কুমার জমিদারের ছেলে শহরে ডাক্তারি পড়তে যান কিন্তু তারপরে তিনি গ্রামে ফিরে আসেন গ্রামের মানুষদের সেবা করার জন্যে। এ গল্পের নায়ক মধুচন্দন চিক্কাদেভাইয়াহ ঠিক তেমনি একজন। তার বাড়ী ভারতের কর্ণাটক প্রদেশের মান্ডিয়া জেলায়।মহিসুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী লাভ করেন এবং এরপরে একজন সফল সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। কিন্তু আজকে তার পরিচয় সফল সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে নয়। তিনি এখন একজন চাষি যিনি জৈব উপায়ে চাষাবাদ করেন। আর তার এ প্রচেষ্টার ফলে আজ তার গ্রামের কৃষকদের মাঝে তিনি আশার আলো  জ্বালিয়েছেন।

17madhu1

৩৭ বছর বয়সী মধুচন্দন সবদিক থেকেই একজন সফল সফটওয়্যার ডেভেলপার ছিলেন। Wipro, HP, TestingCzars এর মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।বিগত ১৫ বছরে মধুচন্দন বিশ্ব ঘুরেছেন। যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, ফিলিপাইন, আফ্রিকাতে কাজ করেছেন। ২০০৫ সালে ভেরিফায়া বলে একটি সফটঅয়্যার প্রতিষ্ঠান চালু করেন। ভেরিফায়া স্টুডিও বলে একটি অটোমেটেড টেস্টিং সফটওয়্যার তৈরি করেন যেটি বিশ্বের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশের সান হোজেতে নিজের বাড়ী স্ত্রী অর্চনা ও মেয়ে অদিতিকে নিয়ে স্বপ্নের জীবন কাটছিল মধুচন্দনের। কিন্তু মধুচন্দনের মনে হলো সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে যা কিছু অর্জন করার তিনি করেছেন। তার নতুন করে পাবার কিছুই নেই। এখন তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সিইও হবেন তারপরে? এখন আর কোন আনন্দ নেই। ২০১৪ এর আগস্টে মধু তার স্ত্রীকে বললেন যে আমার ইচ্ছা আমি মান্ডিয়াতে গিয়ে জৈব উপায়ে চাষাবাদ করব। তুমি কি আমার সাথে যাবে? অর্চনা আর অদিতি পরদিন সারাদিন ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করলেন। আর ১৫দিন পরেই অদিতির স্কুল চালু হয়ে যাবে। চিন্তা-ভাবনা করে তারা বললেন যে হ্যা তারা ফিরে যেতে চান। ব্যস!! যেই কথা সেই কাজ!! সানহোজেতে নিজের বাড়ী গাড়ী সব বিক্রী করে দিয়ে মধুচন্দন ফিরে এলেন নিজের গ্রামে আর শুরু করলেন এক নতুন জীবন।

আপনারা অনেকেই হয়তো পড়েছেন যে ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যার কথা। কর্নাটকের মান্ডিয়াতে এ বছরে সবচেয়ে বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছে। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা নিয়ে বা মহাজনের কাছে থেকে টাকা নিয়ে  তারা চাষ করেন কিন্তু ফসল সেভাবে হয় না দেখে তারা ঋণ শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করে।

মধুচন্দনের বাবা এস চিক্কাদেভাইয়াহ নিজে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ছিলেন। হয়তো পিতার কাছ থেকেই কৃষি সম্পর্কে তার আগ্রহ জন্মেছিল। মান্ডিয়াতে ফিরে তিনি চেয়েছিলেন নিজস্ব একটি ফার্ম খুলতে। কিন্তু কৃষকদের দুরবস্থা দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে তাদের জন্যে কিছু করবেন।

আঁখ এবং ধান হলো মান্ডিয়া এলাকার প্রধান ফসল। মধুচন্দন দেখলেন যে, চাষিরা তাদের পণ্যের সঠিক দাম পায় না। এ থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে চাষিদের জন্যে কিছু করবেন যার মাধ্যমে তারা একদিকে তাদের জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে ফসল উৎপাদন করবে আবার অন্যদিকে ভোক্তাদের কাছে সেই ফসল ভাল দামে বিক্রী করবে।

শুরুটা খুবই কষ্টের ছিল। প্রথম দরকার ছিল কৃষক যোগাড় করা যারা জৈব উপায়ে চাষ করতে আগ্রহী হবে। মূল সমস্যা ছিল চাষিরা তথাকথিত কৃষি বিশেষজ্ঞ যাদের মাঠে কাজ করার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না তাদের পরামর্শ শুনে রাসায়নিক সার সহ বিভিন্ন ধরণের জিনিস পত্র ব্যবহার করত যার ফলে কৃষিজমির উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাহত হতো। আঁখ উৎপাদনের পরে আঁখ কেটে জমিতে যেসব আবর্জনা থাকত তা পুড়িয়ে ফেলত কিন্তু এতে করে ঐ জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যেত। কারণ জমির ঐসব আবর্জনাতে ক্ষুদ্র জীবাণু থাকত যা জমির উর্বরতা ধরে রাখে। দেখা যেতে, মাত্র ৫-৬% কৃষক যারা জৈব উপায়ে কোন রকম রাসায়নির সার ব্যবহার না করে চাষাবাদ করত তারা ভাল ফসল পেত বাকিরা পেত না। এদিকে ব্যাঙ্ক এবং মহাজনেরা তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলত। তখন তাদের আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন গতি থাকত না।

মান্ডিয়া থেকে বেঙ্গালুরু দুই ঘন্টার পথ এবং বেঙ্গালুরুতে কেমিকালবিহীন পণ্যের খুবই ভাল চাহিদা আছে। ইতিমধ্যেই ভারতের বিখ্যাত কৃষিবিদ সুভাষ পালেকর এর কর্মশালায় যোগদান করে বেশ কয়েকজন কৃষক জৈব উপায়ে চাষ করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। এখানে বলে রাখি যে, সুভাষ পালেকর ভারতে “Zero Budget Natural Farming”  অর্থাৎ শূন্য টাকায় প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ প্রথাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি ভারতে জৈব উপায়ে চাষাবাদের একজন পুরোধা। তো প্রথমে এরকম কয়েকজন চাষি জোগাড় করা হয় যারা জৈব উপায়ে চাষ করবে।

17madhu9

এরপরে মান্ডিয়ার এক বন্ধুর কথায় মধুচন্দন বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এর সাথে কথা বলেন। তিনি মধুচন্দনকে একটি কো-অপারেটিভ সোসাইটি তৈরি করার পরামর্শ দেন এবং বলেন যে এর মাধ্যমে অর্গানিক পণ্য সংগ্রহ এবং বাজারজাত করতে।

মান্ডিয়া জেলার পানাকানাহাল্লি গ্রামের একজন চাষি ছিলেন নাম ভেঙ্কটেশ। এ লোক দীর্ঘদিন ধরে জৈব উপায়ে সফলতার সাথে চাষাবাদ করেছেন। তাঁর চোখের সামনেই তিনি একজন ৩৫ বছর বয়সের চাষিকে আত্মহত্যা করতে দেখেছেন। এলাকার চাষিদের সমস্যার কথা তিনি খুব ভালভাবে জানতেন। তিনি মধুচন্দনের সাথে এগিয়ে এলেন কো-অপারেটিভ সোসাইটি খোলার জন্যে। দুজনে মিলে চালু করলেন মান্ডিয়া অর্গানিক ফার্মার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি (Mandya Organic Farmers Cooperative Society)। চাষি, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক, কৃষিবিদ সবাই এ কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে যোগ দিলেন। এ সোসাইটির মাধ্যমে মধুচন্দন মান্ডিয়ার চাষিদের কিভাবে জৈব উপায়ে কোন রকম রাসায়নিক সার বা ক্ষতিকারক এবং উচ্চমূল্যের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ করতে পারবে তা হাতে কলমে শেখান। বর্তমানে ২৭০ জন চাষি এ কো-অপারেটিভ ফার্মের সাথে যুক্ত হয়ে জৈব উপায় চাষাবাদ করে নিজেদের পণ্য বিক্রী করছেন এবং সাফল্যের মুখ দেখেছেন।

17madhu10

পাশাপাশি এসব পণ্য বিক্রীর জন্যে বেঙ্গালুরু-মাইশোর হাইওয়ের কাছে বুদানুরে এক খন্ড জমিতে মধুচন্দন একটি অর্গ্যানিক জোন স্থাপন করলেন যার নাম “অর্গানিক মান্ডিয়া” । বেঙ্গালুরু-মাইশোর হাইওয়ে খুবই ব্যস্ত একটি সড়ক। প্রচুর লোক এ সড়কে যাতায়াত করে। তাই এ জোনটি অনেক লোকের চোখে পড়বে। এ চিন্তা থেকেই হাইওয়ের পাশে এ জোনটি স্থাপিত হয়। এ জোন স্থাপনের জন্যে চার জন সফল আইটি প্রফেশনালদের কাছে থেকে মধুচন্দন ১ কোটি রুপি যোগাড় করেন।

এ বছরের অক্টোবর মাসে জোনটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। এ জোনে একটি সুপারমার্কেট আছে যেখানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত সবজি, আঁখ, নারিকেল, সহ ৩২ রকমের অর্গানিক আইটেম বিক্রী হয়ে থাকে। এ সুপারমার্কেটের পণ্য ইতিমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে।

মে মাসে পণ্য বিক্রীর জন্যে একটি মেইল-অর্ডার ক্যাটালগ এবং ফেইসবুক পেইজ চালু করা হয় (www.facebook.com/organicmandya/ )। মধুচন্দন তার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করেন পণ্য বিক্রীর জন্যে। প্রাথমিক ভাবে ১০০০ ক্রেতা হয়ে গিয়েছে। ৩০০০ রুপির মধ্যে বিভিন্ন ধরণের পণ্য কিনতে পাওয়া যায়। ফেইসবুক  পেইজের মাধ্যমে প্রচুর পণ্যের অর্ডার আসে। অক্টোবরের ২৫ তারিখের মধ্যে ১২ লক্ষ রুপি আয় হয় এ জোন থেকে।

মধুচন্দন মনে করছেন যে বর্তমান হারে ব্যবসা বাড়তে থাকলে ২০১৬ সালের মধ্যে ব্যবসার আকার বেড়ে ৮-১০ কোটি রুপিতে পৌছাবে এবং নেট লাভ থাকবে ১০-১৫%।মধুচন্দনের এখন লক্ষ্য হচ্ছে ব্যবসা বাড়িয়ে ৩৬ কোটি রুপিতে নিয়ে যাওয়া তাহলে একটি পুরো তালুকের কৃষকরা আয় করতে পারবে।

মধুচন্দনকে এলাকার কৃষকরা আদর করে “মধুআন্না” বলে ডাকে। ভারতের অনেক জায়গা থেকে লোকে তার সাথে যোগাযোগ করে কিভাবে তার মতো এরকম কো-অপারেটিভে সোসাইটি তৈরি করা যায়।

শেষ করছি মধু আন্নার একটি সুন্দর উক্তি দিয়ে-

“আমরা ছোট দিয়ে শুরু করেছি। আমাদের এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এখনো লোকে মনে করে যে আইটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিই সেরা চাকরি। কিন্তু কেউ একজন তরুণ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের কষ্ট দেখেনা। তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হয়, বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়, জ্যাম ঠেলে কষ্ট করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়।সেই তরুণের চেহারায় আমি ঔজ্জ্বল্য দেখিনা বরং দেখি ৬৫ বছর বয়সী কষ্টে জর্জরিত বৃদ্ধ এক চাষির মুখ। চাষিদের কষ্ট থেকে তরুণদের শেখার অনেক কিছু আছে। একজন চাষি যে কিনা গ্রামে ১০,০০০ রুপি আয় করে সে শহরে ১ লাখ রুপি আয় করা একজন ইঞ্জিনিয়ার এর চেয়ে অনেক সুখী এবং স্বাস্থ্যবান জীবন যাপন করে।”

লেখকঃ এস এম মেহদি হাসান

সূত্রঃ

রেডিফ

দ্যা ইকনোমিক টাইমস

Comments

comments