তাসনূভা শামীম ফাউন্ডেশন ও প্রতিবন্ধি সন্তানের পিতামাতা

তাসনূভা শামীম ফাউন্ডেশন ও প্রতিবন্ধি সন্তানের পিতামাতা

1374
0
SHARE
tasnuva shamim

তাসনূভা শামীম ফাউন্ডেশন ও একজন প্রতিবন্ধি সন্তানের পিতামাতা

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

শামীম দম্পতি
শামীম দম্পতি

সাগর আহমেদ শামীম বাংলাদেশের হবিগঞ্জ শহরে মাহমুদাবাদ এলাকায় তার বাড়ি, তিনি নেদারল্যান্ড থেকে ইন্টারন্যাশনাল টুরিজম ম্যানেজমেন্ট এন্ড কনসালটেন্সি ও বিবিএ কম্পিলিট করেছেন ২০০৩ সালে। তার স্ত্রী এডভোকেট লাভলী ইয়াসমিনকে নিয়ে আয়ারল্যান্ড প্রবাসী। তার স্ত্রীও হবিগঞ্জের কৃতিসন্তান তখনকার সময়ে এসএসসিতে স্ট্যান্ড ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এল্‌লেএম শেষ করে নেদারল্যান্ড এর Utrecht University থেকে Human Rights এর উপর মাস্টার্স করেছেন। দুজনেই নরম মনের মানুষ। মানুষের সাথে সহজে মিশে যান পরকে আপন করার এক সহজাত ক্ষমতা আছে তাদের। শামীম দস্পতির ফুটে ফুটে দুটো কন্যা সন্তান সারাদিন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে তাদের ছোট ফ্লাটটিকে মাতিয়ে রাখতো। দিনশেষে কাজের অবকাশে শামীমভাই দুটো মেয়ের মুখ দেখে শান্তি পেতেন। এমন অবস্থায় তৃতীয় সন্তানের মুখ দেখতে চলেছেন শামীম দম্পতি। সন্তান ছেলে কি মেয়ে হবে এই নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা ছিলোনা মোটেই। সুস্থ্য সন্তানের আশাই ছিলো অন্যসব বাবা মার মতো। ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসে ডাবলিনের হলস্ট্রিট হাসপাতালে মিসেস শামীম আরো দুটো কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন। তারা জানতেন তাদের দুই সন্তান একই সাথে হলস্ট্রিটের জনসংখ্যায় যোগ হচ্ছেন। নাম ধামও মোটামোটি ঠিক করা ছিলো।

11139546_1066517973364457_1013738987_n

একদিন হঠাৎ হসপিটালে চেকআপ করতে গেলে ডাক্তার জানালো দুটি বাচ্চার মধ্যে একটি বাচ্চার হার্টবিট পাওয়া যাচ্চেনা। চেকআপ করে দেখা গেলো একটা বাচ্চা মাতৃগর্ভেই মারা গেছে। আর অন্য বাচ্চাটি বাঁচাতে হলে এখনি অপারেশন করতে হবে।অপারেশান এর পর দুটি বাচ্চা পৃথিবীর আলোতে আসলো একটি বাচ্চা মৃত অন্যটি জীবিত।নিজের চোখের আলো নিভিয়ে সে হারিয়ে গেলো সে নিকষ অন্ধকারে যেখানে গেলে স্রষ্টার সাথে মিলিত হওয়া যায়।তার সহযাত্রী তাসনূভাকে ছেড়ে ফাতিমা একাই চলে গেলো না ফেরার গন্তব্য। মৃত বাচ্চাটির নাম রাখা হলো ফাতিমা শামীম আর অন্য বাচ্চাটির নাম তাশনুভা শামীম।

তারপর বুকভরা শ্বাস নিয়ে দুনিয়ার বিছানায় পা রাখলো তাসনূভা শামীম। তাসনূভা শামীম জন্মের পর সুস্থ্য ছিলো কিন্তু ৫ দিন পর সমস্যা ধরা পড়ে।ডাক্তারগণ তাদের চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। শিশুটির মাতা পিতা পরম করুণাময়ের করুণা ভিক্ষে করলেন। শিশুটি বেচে বর্তে উঠলো। খুব ধীর গতিতে বেড়ে উঠতে লাগলো। কিন্তু আর সুস্থ্য হলো না। হ্যাঁ মানসিক ও শারীরিক ভাবে এক প্রতিবন্ধি সন্তানের বাবা মা হলেন তারা। শুরু হলো আরেক অনন্ত পথচলা। আকাশ ভেঙ্গে পড়লো মাথায়? না পড়েনি, স্বামী স্ত্রী দুজনেই শিক্ষিত সচেতন ও ধার্মিক। এই নিষ্পাপ শিশুটিকে তারা রবের পক্ষ থেকে এক উপহার হিসেবে গ্রহণ করলেন। তারপর দিন মাস বছর যায়। তাসনূভা ঠিক একই রকম, না সে কোনো কথা বলতে পারে, না ক্ষুধা তৃষ্ণায় কোনো অনূভূতি ব্যক্ত করতে পারে, না নিজে কিছু খেতে বা পান করতে পারে। আজ তার বয়স 9 বছর হতে চলল। এখনো ৬ মাসের শিশুর মতোই হুইলচেয়ারে বসে থাকে।

বিদ্যূষী মাতা আর ধৈর্যশীল পিতা সারাক্ষণ তার দেখভাল করেন। তাসনুভা তার পিতাকে এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিলো। শামীম ভাই অনুভব করলেন প্রতিবন্ধি মানুষদের কষ্ট আর প্রতিবন্ধি সন্তানের পিতামাতাদের মনোবেদনা। তিনি গঠন করলেন তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডে দু জায়গায় আজ টিএসএফ বিধিবদ্ধ এক চ্যারিটি সংস্থা। তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের অধীনে হবিগঞ্জে শত শত মানুষকে সাহায্য করছেন শামীম ভাই। এ যাবত প্রায় শতাধিক হুইলচেয়ার ও সাদাছড়ি বিতরণ ,হাজারো বস্ত্র, ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাবার, শিক্ষিত দরিদ্রদের মাঝে কোরআন বিতরণ, এবং এতিমখানা ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন হবিগঞ্জে।

সেলাই মেশিন সেলাই প্রশিক্ষণ খাবার বিতরণ শিক্ষা প্রশিক্ষণ, চিকিৎসার জন্য অর্থ সাহায্য, এসবতো সারা বছরই চলছে। একসময় মনে হলো এভাবে সারা বছর এই সব প্রতিবন্ধি লোকদের সাহায্য দিয়ে তাদের করুনার পাত্র বানানোর কোনো মানে নেই। তাদের প্রশিক্ষণ, কর্মপ্রেরণা, কাজ দেয়া, চিকিৎসা এবং পূর্নবাসন এর জন্য স্থঅয়ী ও অবকাঠামো সুবিধা প্রয়োজন। তার জন্য প্রথমে প্রয়োজন ভূমি তারপর অর্থ ও অন্যান্য। হবিগঞ্জে কাজের জন্য ছোট একটা টিম করা হলো, তাদেরকে পরামর্শ দেয়ার জন্য এবং প্রশিক্ষণের জন্য আমিও (জাহাঙ্গীর আলম শোভন) মাঝে মধ্যে যাই। শামীমভাই কাজ চলতে থাকলো, কিন্তু নিজের গন্ডির বাইরের লোকদের সহযোগিতা যা পাওয়া যায় তা খুব সীমিত। সবচে বড়ো কথা একটা বড়ো জমি দরকার, সেটা পাওয়া যেমন কঠিন তেমনি কিনতে গেলে বিশাল আর্থিক যোগানের প্রয়োজন। এক পর্যায়ে সাগর আহমেদ শামীশ ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এই কাজের জন্য একটি উপযুক্ত জায়গায় ব্যবস্থা করবেন যেখানে তাসনুভা শামীশ প্রতিবন্ধি পূর্নবাসন কেন্দ্র নির্মিত হবে। এবং এজন্য তিনি নিজের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার দাদা হাজী আবদুর রহিম এলাকার একজন প্রভাবশালী লোক ছিলেন, জমিজমাও ছিলো বেশ, ছোটবেলা থেকে শামীমভাই দাদার কাছে কাছে থাকতেন, দাদার খেদমত করতেন, দাদাও তাকে একটু বেশী ভালোবসতেন, সেজন্য তিনি নাতিকে আলাদা করে একটি জমি দিয়ে যান, যা দিয়ে তিনি প্রয়োজনে পড়ালেখার খরচ চালাতে পারেন।

কিন্তু সৌভাগ্যবশত শামীম সাহেব বিদেশে স্কলারশীপের মাধ্যমে লেখাপড়া করায় জমিটি থেকে যায়। শেষতক দাদার দানকরা জমি বিক্রি করে তিনি অসহায় মানুষের জন্য কিছু করতে চান।

এই সেই লক্ষ্য তার বাবাকে অনুরোধ করে যে দাদার দেয়া এই জমিটা ভালো দামে বিক্রি করা গেলে অন্যত্র একটা বড়োজমি কেনা যেতে পারে প্রতিবন্ধি পুর্ণবাসন কেন্দ্রের জন্য।

০০০০০০০০০০০০০০০০০০_n

তখন তিনি দেশে, হবিগঞ্জের জেলা প্রশাষক জয়নাল আবেদীনকে প্রধান অতিথি করে গত বছর 3 ডিসেম্বর প্রতিবন্ধি দিবসে সাদাছড়ি. হুইলচেয়ার, খাবার ও কোরআন বিতরনের এক কর্মসূচেী দেয়া হলো, হবিগঞ্জের বিশিষ্ঠ ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ও হ্যাঁ আরেকটা কথা বলা হয়নি, শামীম ভাইয়ের বাসার পাশে হবিগঞ্জ শহরে 26 কাঠা জমির সন্ধান পাওয়া গেলো যেটা একটা পরিত্যক্ত ডোবা। এই ডোবাটি সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়ার জন্য আগে থেকেই চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু সত্যি সত্যি পাবেন অতোটা আশাবাদী ছিলেন না। সেজন্য নিজেই সবকিছু দেবার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু গত 2014 সালের 3 ডিসেম্বর সেদিন আমি নিজেও হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত ছিলাম। জেলা প্রশাসক সেদিন মৌখিক ভাবে জমিটি তাসনূভা শামীম ফাউন্ডেশনকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেয়ার ঘোষণা দিলেন।অল্প কিছুদিনের মধ্যে হয়তো কাগজপত্র হাতে পেয়ে যাবেন।

12388325_1217098204973099_352108766_n

হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন, এডিসি বিভিন্ন দলের নেতারা করতালী দিয়ে এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানালেন। পরে কয়েক মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজী পক্রিয়া এবং মাটি ভরাটের কাজ করা হয়েছে। আশা করা যায় কিছু দিনের মধ্যে সেখানে স্থাপনা দাড়িয়ে যাবে। ইতোমধ্যে একটি ভবনের কাজ শুরু হয়ে গেছে সেখানে এতিমরা থাকা ও পড়ার সুযোগ, আর প্রতিবন্দিদের জন্য ফিজিওথেরাপী চিকিৎসা চলছে। দ্বিতীয় ভবন হয়ে গেলে প্রতিবন্ধিদের পূর্নবাসন ও ট্রেনিং শুরু হবে। একটি সুন্দর লে আউট তৈরী করা হয়েছে। এখানে থাকবে টিএসএফ এর কার্যালয়, প্রশিক্ষণার্থী প্রতিবন্ধিদের জন্য থাকা খাওয়া, তাদের উৎপাদিত পন্য বিক্রির একটা শোরুম, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নার্সারি, একটি স্ব্াস্থ্যকেন্দ্র ফিজিওথেরাপি সুবিধা, স্কুল, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। খুব কাছ থেকে আমি এই পক্রিয়া শামীম ভাইয়ের টেনশান, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা চূড়ান্ত হাসি সব দেখেছি। দেখেছি তার সামাজিকতা ও নানা কর্মসূচী। তাসনূভার জন্ম ও প্রতিদ্ধন্ধি হওয়া আজ শত শত প্রতিবন্ধির জন্য আর্শীবাদ হয়ে গেলো। একটি দু:খের গল্প আজ একটি সাফল্যের গল্পে রুপ নিলো। চোখের সামনে একজন পিতা হয়েগেলেন হাজারো প্রতিবন্ধির পিতা। এখনো শামীম ভাই দেশে আসেন প্রতি বছর যারা বলেন পিতামাতার পাপের কারণে সন্তান প্রতিবন্ধি হয়, আমি তাদের মুখে ঝামা ঘষে দিতে পারি। কারণ তাসনূভা জন্মের আগেও শামীম ভাই ভীষন ভালোমানুষ ছিলেন এবং গরীব দূ:খীদের সাহায্য করতেন। এখনো দেশে আসলে রাস্তায় খোড়া ভিক্ষুকের সাথে কথা বলতে তিনি রাস্তায় বসে পড়েন, অন্ধবুড়োকে বুকে টেনে নিন, মাজুর কিশোরের মুখে নিজহাতে খাবার তুলে দেন, পোলিও আক্রান্ত ময়লা কাাঁদামাখা হতদরিদ্র পরিবারের শিশুকে কোলোনিয়ে নিজে কাঁদা মাখিামাখি হয়ে যান।তিনি সারাজীবন অসহায় মানুষের সেবা করতে চান। এটা কোনো নেতার ব্কতব্য নয় এটা একজন নিরলোভ মানুষের আন্তরিক ইচ্চা। আমি দেখেছি একজন বাবা কিভোবে প্রতিবন্ধি সন্তানকে যত্নও লালন পালন করেন।

এভাবে একজন সাধারণ মানুষ একজন ত্রাতা হয়ে দেখা দিয়েছে অসহায় দরিদ্র ও প্রতিবন্ধি মানুষদের জন্য। যেখানে একজন মানুষ হতাশ হয়, জীবনের গতি হারিয়ে ফেলে, সেখান একজন মানুষ সমাজের জন্য দাড়িয়ে গেলে এবং নিজের জানমাল দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

সাগর আহমেদ শামীম:

https://www.facebook.com/profile.php?id=100000187943665

 

Comments

comments