SHARE

 

উপরের ছবির এ মহিলাটিকে প্রথম দেখাতেই এর সম্পর্কে কারো খুব একটা ভাল ধারণা হবে না। ইনি দেখতে সাধারণ হতে পারেন কিন্তু এর পরিচয় ইনি ভারতের প্রথম সারির একজন  অঙ্কোলজিস্ট।  অঙ্কোলজিস্ট হচ্ছেন যিনি ক্যান্সারের উপরে বিশষজ্ঞ। এ মহিলার নাম ড: বিজয়লক্ষী দেশমানে।

আপনারা সবাই বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের গভর্ণর ড: আতিউর রহমান এর কথা জানেন। একজন সামান্য কৃষক পরিবারের ছেলে টাকার অভাবে কিনা যার পড়াশুনাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তিনি নিজের চেষ্টা এবং পরিশ্রম এর জোরে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিজয়লক্ষী দেশমানের গল্পটাও অনেকটা ড: আতিউর রহমানের মতোই।

“ভারতের সবচেয়ে নিম্নবর্ণের একটি হিন্দু সম্প্রদায়ে আমার জন্ম সম্প্রদায়ের লোকেরা অন্যের ব্যবহার করা স্যান্ডেল সেলাই করে পরে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন আমার বাবাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল তিনি জনমানুষের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করতেন যদিও তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তিনি তার সম্প্রদায়ের পেশা গ্রহণ না করে নিজে নিজেই কাজ শিখেছেন”

কথাগুলো বিজয়লক্ষীর। ১৯৫৫ সালে ভারতের কর্ণাটক প্রদেশের গুলবর্গা শহরের এক বস্তিতে বিজয়লক্ষীর জন্ম। তার বাবা বাবুরাও দেশমানে নিজের চেষ্টায় মারাঠি, হিন্দী, কান্নাড়া, এবং ইংরেজী ভাষা আয়ত্ত করেন। তিনি একটি কারখানায় কাজ করতেন এবং নিজ যোগ্যতায় আস্তে আস্তে উন্নতি করে ভাল পদ পেয়েছিলেন। বিজয়লক্ষীর মা রত্নাম্মা ছিলেন একজন সব্জি বিক্রেতা।স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর বোন বিজয়লক্ষী পণ্ডিত যিনি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তাঁর নামানুসারে বিজয়লক্ষী নাম রাখা হয়। ছয় বোন এক ভাইয়ের বিশাল সংসার সামলাতে তার বাবা-মাকে হিমশিম খেতে হতো। বিজয়লক্ষীর মায়ের একটি ছোট সব্জির দোকান ছিল। তিনি আর তার ভাই তার মাকে সাহায্য করতে মাথায় করে সব্জি বয়ে নিয়ে যেতেন।

বিজয়লক্ষীর মা তাকে পড়াশুনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার উৎসাহ দিতেন। তার মেডিকেলের ফি যোগানোর মতো সামর্থ্য তার বাবা-মায়ের ছিল না। তার মা নিজের মঙ্গলসূত্র বন্ধক রেখে বিজয়লক্ষীর মেডিকেল কলেজের ভর্তি ফি দিয়েছেন।

“তখনকার দিনে আমাদের সম্প্রদায়ে কেবল ছেলেরাই বিদ্যালয়ে যেতে পারত কিন্তু আমার বাবা আমাদের সব ভাইবোনকে স্কুলে পাঠিয়েছেন তখনকার দিনে একটি নিম্নবর্ণের হিন্দু পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়াটা কেউ কল্পনাও করতে পারত না আমাদের স্বপ্ন ছিল জীবনে ভাল একটা কিছু করা।”

১৯৮০ সালে কর্ণাটক মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৮৩ সালে বেল্লারি (Bellary) থেকে এমএস সমাপ্ত করেন। এরপরে তিনি স্তন ক্যান্সারের উপরে বিশেষজ্ঞ হন। মেডিকেল কলেজ এর শুরুটা বিজয়লক্ষীর জন্যে বেশ কঠিন ছিল। প্রথম বর্ষে তিনি ফেইল করেন। কারণ তিনি পড়াশুনা করে এসেছিলেন কান্নাড়া ভাষায় কিন্তু মেডিকেল কলেজে ইংরেজীতে সবকিছু করতে হতো। এ ব্যাপারে তার অধ্যাপকরা তাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেন। তাদের সাহায্য এবং নিজের পরিশ্রমের জোরে বিজয়লক্ষী দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই ভাল ফলাফল করতে থাকেন। তিনি মেডিকেল কলেজে প্রথম শ্রেণীতে পাস করেন। যখন তার বাসায় এ খবর পৌছাল তার পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।

বিজয়লক্ষী সার্জারিতে এম এস করার পরে কিদওয়াই ইন্সটিটিউট অব অঙ্কোলজির সার্জিকাল অঙ্কোলজি বিভাগে একজন সিনিয়র রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। ড: বিজয়লক্ষী বিয়ে করেন নি। সারাজীবন পড়াশুনা আর গবেষণা করেছেন। তার এ নিরলস পরিশ্রমের ফলে তিনি ভারতের প্রথম সারির একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হয়েছেন। তিনি কর্ণাটক ক্যান্সার সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।

সম্প্রতি ড: বিজয়লক্ষী ব্যাঙ্গালোরের কিদওয়াই মেমোরিয়াল ইন্সটিটিউট অব অঙ্কোলজি এর সার্জিকাল অঙ্কোলজি বিভাগের প্রধানের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাই বলে তিনি বসে নেই।তার কাজ কেবল অর্ধেক শেষ হয়েছে। তিনি বিভিন্ন সমাজ কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত আছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে মাসের ১৫ দিন এধরণের কল্যাণমূলক কাজ করবেন এবং বাকী ১৫ দিন বিনা-পয়সায় গরীব দুঃস্থদের সেবা-শুশ্রূষা করবেন।

লেখক:

এস এম মেহদী হাসান

সূত্র:

ইয়োর স্টোরি

দ্যা বেটার ইন্ডিয়া

টাইমস অব ইন্ডিয়া

Comments

comments