জীবন নিয়ে অনুপ্রাণিত হওয়ার চলচ্চিত্র – The Diving Bell and the Butterfly

জীবন নিয়ে অনুপ্রাণিত হওয়ার চলচ্চিত্র – The Diving Bell and the Butterfly

1093
0
SHARE

জীবন একটা উপহার , সেই উপহারটা খুব অল্প সময়ের জন্যে মানুষ উপভোগের সুযোগ পায় । সেই জীবনেও অনেক অম্ল-মধুর মুহূর্ত থাকে , কিছু মুহূর্ত আপনার জন্যে অবশ্যই ভালোলাগার অর্থবহতা আনবে আর কিছু মুহূর্ত কঠিনতম সময়ের সামনে আপনাকে উপনীত করবে । সেই মুহূর্তগুলো কখনই কারো কাম্য নয় , কিন্তু মাঝে মাঝে জীবনের সহজ-সরল গতিপথ রুঢ় হয়ে ওঠে । জানালা দিয়ে দেখা সামনের বাড়ি , জানালা দিয়ে দেখা সুবিশাল আকাশ সবকিছু মানুষের কাছে অনেক দূরের কোন বস্তু বলে মনে হয় । এই অবস্থান , এই গতিপথ তখন সেই দুর্ভাগা মানুষের জীবনের অর্থ বদলে দেয় । জীবন আসলে কি ? বেঁচে থাকাই কি শুধু জীবন নাকি তার চেয়ে বেশি কিছু ? জীবন যত ছোট , ঠিক তার থেকেও বিশাল গভীরতার গল্প নিয়ে জীবন ।

প্রজাপতির মতন রঙিন ডানা মেলার স্বপ্ন নিয়ে জীবনের পুরো সময়টা অতিবাহিত করা যায়না , জীবন একটা গন্তব্য আর সেই গন্তব্যে মানুষের সময়গুলো প্রতিনিয়ত পরিস্ফুটিত হয় ভালো ও মন্দ দুই দিক নিয়েই । ফ্রান্সের চলচ্চিত্র The Diving Bell and the Butterfly গল্প এর লেখক জিন ডোমেনিক বউবি’র আত্নজীবনী ঘিরে । ব্যস্ততম ফ্রান্সের বিখ্যাত “ইলি ম্যাগাজিন” এর একজন সম্পাদক ছিলেন জিন ডোমেনিক বউবি । কিন্তু তার ব্যস্তময় জীবনে একদিন ছন্দপতন ঘটে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরের আট তারিখে । ছেলেকে নিয়ে গাড়ি চালানোর মধ্যেই নিজের মাঝে হঠাৎ কিছু পরিবর্তন শুরু হয় তার এবং কিছুক্ষণের মাঝেই সাংবাদিক জিন ডোমেনিক বউবি গাড়ি থামিয়ে ফেলেন । তিন সন্তান ও ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে জীবনের সুন্দরতম মুহূর্তগুলো কাটানোর সময়ে গাড়িতেই স্ট্রোক করলেন এবং হাসপাতালে কোমা অবস্থা থেকে যখন তার জ্ঞান ফিরল এর মাঝে পেরিয়ে গেছে জীবন থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ ।

জিন ডোমেনিক বউবি হাসপাতালের বেডে নিজেকে “ লকড ইন সিনড্রোম” অবস্থায় আবিস্কার করলেন । এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে তার সম্পূর্ণ শরীর প্যারালাইজড হয়ে যায় । শুধু মাঝে মাঝে হালকা ঠোঁট নাড়াতে পারে কিন্তু কথা বলতে পারেনা কিংবা ইশারা দিতে পারেনা । শরীরে অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে শুধু তার বাম চোখ ঠিক মতন কাজ করছে , ডান চোখে সমস্যা হওয়ার কারণে ডাক্তাররা ডান চোখ সেলাই করে বন্ধ করে দেন । এরকম মুহূর্তে একজন মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছে কিংবা কোন অনুপ্রেরণা কাজ করেনা , কিন্তু এই হাসপাতালের বেডে শুয়েই জিন ডোমেনিক বউবি লিখে ফেললেন নার্সের সহযোগিতায় তার আত্নজীবনী বই “Le scaphandre et le papillon” । সাংবাদিক জিন ডোমেনিক বউবি তার চোখের পাতা একবার বন্ধ করে একবার খুলে, আর এ ইশারা অনুসরণ করেই নার্স লিখলো তার জীবনী নিয়ে বই । আর তার জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র The Diving Bell and the Butterfly । শুধুমাত্র একটি চোখ দিয়ে অভিনেতা হাসপাতালের জীবনের সমস্ত অংশটুকুর চমৎকার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন । অসাধারণ কাহিনীর এ ছবিটি গোল্ডেন গ্লোব, কান চলচ্চিত্র উৎসবের মত অসংখ্য চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পায়। ফ্রেন্স ভাষায় নির্মিত ২০০৭ সালে মুক্ত পাওয়া চলচ্চিত্রটিতে প্রথমে জনিডেপ এর অভিনয়ের কথা থাকলেও জনিডেপ শিডিউলের জন্যে অভিনয় করতে না পারায় পরবর্তীতে এতে মূল চরিত্রে অভিনয় করে ম্যাথিউ আমালরিক । অসাধারণ নির্মাণ , উপস্থাপন, একটা শব্দ বলতে দুই মিনিটের কাছাকাছি সময় ধরে চোখের পাতা নড়া , ক্যামেরার এঙ্গেলগুলো অনেকটা হৃদয়াবেগে জর্জরিত করবে দর্শকদের ।

চলচ্চিত্রটি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকদের হৃদয়ে ধাক্কা লাগার মতন বিষয় ঘটবে । চলচ্চিত্রের শুরুতে জিন ডোমেনিক বউবি’র সেই বাম চোখ দিয়ে হাসপাতালের জীবনের সময়টাকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করেন এর নির্মাতা জুলিয়ান স্যানাবেল । বাম চোখ দিয়ে জিন ডোমেনিক বউবি নিজের আত্নজীবনীর গল্প বলতে থাকেন নার্সকে । নিজের ভালো লাগা মুহূর্তগুলো ফ্ল্যাশব্যাক হতে থাকে কল্পনার ফ্রেমে যা চলচ্চিত্রের পর্দাজুড়ে দর্শকদের ভাবনা করার অবকাশ দিবে । নার্স যখন একেকটা অক্ষর জিন ডোমেনিক বউবি’কে দেখায় আর সে যখন অপেক্ষায় থাকে কখন তার মনের মধ্যে থাকা অক্ষর নার্স তাকে দেখাবে, সেইরকম মুহূর্তে বুকের মধ্যে একটা হু হু আর্তনাদ ঘুরে বেড়াবে । জীবনটা আসলে কি ? পর্দার ফ্রেমে দেখা সময়গুলোতে মনে হবে বেঁচে থাকাটা কতটা একজন মানুষের কাছে আকাংখিত হতে পারে ।

একেকটা অক্ষরের জন্যে জিন ডোমেনিক বউবি’র অপেক্ষা দেখে খুব খারাপ লাগবে । জিন ডোমেনিক বউবি’র অপেক্ষা কখন তার জীবনী লেখার অক্ষর আসবে , আর সে একবার তার চোখের পাতা ফেলবে । কারো সাথেই কোন কথা না বলতে পারার আক্ষেপ যেন জীবনের অনেক ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে নিয়ে যাবে । ৯২ বছর বয়সী অসুস্থ বাবার সাথে ছেলের কথা বলতে না পারার দৃশ্য এবং ছেলে ও বাবার টেলিফোনের দুই প্রান্তে চোখ দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া কান্নাজল জীবনটা অদ্ভুত এক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয় চলচ্চিত্রে । বাবা কথা বলে কাঁদে , আর ছেলে যখন চোখের ইশারায় বলে কেঁদোনা বাবা ঠিক তখন এক হু হু হাহাকার একবার হলেও আপনাকে গ্রাস করতে বাধ্য করবে ।

জীবনের যাবতীয় সংজ্ঞা পাল্টে যাওয়া একশ বারো মিনিটের এ চলচ্চিত্রে বেঁচে থাকার জন্যে আকুতি , নিজের গল্পগুলো বলে যাওয়ার চেষ্টা দেখে অনায়াসে কিছু প্রশ্ন চলে আসতেই পারে – তাহলো বেঁচে থাকাটা অনেক আনন্দের , সুস্থ থেকে বেঁচে থাকা এবং পৃথিবীটার সৌন্দর্য অবলোকন , এর আকাশ – বাতাস দেখা , প্রতিটি মুহূর্তের যে স্বাদ তার থেকে বড় জীবনে কিছু হতে পারেনা । শুধুমাত্র হাসপাতালের জানালার ওইপাশের জীবনটা একরকম আর বেডে শোয়া জিন ডোমেনিক বউবি’র জীবনটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ।

জীবনে বেঁচে থাকার প্রেরণা নিয়ে গল্প যখন বাস্তব জীবনের গল্প হয় তখন ভাবতেই পারে একজন মানুষ জীবনটা চমৎকার একটা উপহার স্রষ্টার । প্রতিটা মুহূর্ত ভালো কিছু করার , ভালোভাবে উপভোগ করার । জীবন একটাই , মরে গেলে কিচ্ছু থাকবেনা । কাদাজল মাখতে পারবেননা আপনি গায়ে , ইচ্ছে করলে ঘুরতে পারবেন না , ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাবেন না । ইচ্ছে হলে কথা বলতে পারবেন না, কাউকে ভালোবাসতে পারবেন না কিংবা ভালোবাসি এ কথাটিও বলতেও পারবেন না । জীবন অতি ক্ষুদ্র এবং আমরা এই ক্ষুদ্র সময়টার ভেতর ছুটছি ।

-সংগৃহীত

মূল লেখার লিংকঃ Celluloid Diary । সেলুলয়েড ডায়েরী

Comments

comments