SHARE

লেখকঃ সোহেল মৃধা
প্রধান নির্বাহী, Keenlay.com

অনুপ্রেরণা, উদ্যোম, বা এগিয়ে চলার সাহস আসতে পারে অনেক জায়গা থেকে। একটি ভাল বই, একটি ভাল ফটোগ্রাফ, একটি ভাল গল্প, একটি ভাল গান এমনকি একটি ভাল সিনেমা ও হতে প্রেরনার এক শক্তিশালী উৎস। এ লেখাটিকে একই সাথে বলা যেতে একটি ভাল বই, একটি ভাল গল্প, একটি ভাল ফটোগ্রাফ, বা একটি ভাল সিনেমার গল্প।

 

হাচিকো একটি জাপানী কুকুর। ও জন্মগ্রহণ করে জাপানের অডাটে, আকিতা শহরে। হাচিকোকে মনে করা হয় এই গ্রহের সবচেয়ে প্রভুভক্ত কুকুর হিসেবে কেননা সে তার মালিকের মারা যাবার ১০ বছর পরেও তার (মালিকের)অপেক্ষায় ছিল। জাপানে হাচিকো ‘চুকেন হাচিকো’(যার মানে বিশ্বস্ত হাচিকো) বলে পরিচিত।

 

হাইডেস বুর ইউনো ছিলেন একজন প্রফেসর যিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। ১৯২৪ সালে তিনি সোনালী ও বাদামী রঙয়ের আকিতা কুকুর হাচিকোকে পোষা হিসেবে গ্রহণ করেন। হাচিকো তার মালিকের সাথে থাকাকালীন সময়ে প্রত্যেক দিন বিকেল বেলা নিকটবর্তি সিবুয়া ষ্টেশনে গিয়ে বসে থাকতো যেন তার অফিস ফেরত মালিককে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। এই জুটি ১৯২৫ সালের মে মাসে প্রফেসর উনোর মারা যাবার পূর্ব   পর্যন্ত নিয়মিত এমনটাই করে আসছিল।একদিন প্রফেসর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন কিন্তু আর ফিরে এলেন না। প্রফেসর ইউনো সেরিবেরাল হেমোরেজে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন, এবং সেদিন থেকে তিনি আর কখনোই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ষ্টেশনে ফিরে আসেননি। কিন্তু এদিকে হাচিকো বরাবরের মতই প্রতিদিন ঠিক বিকেল ৫ টায় ষ্টেশনে গিয়ে তার প্রভুর জন্য অপেক্ষা করছিল।

 

সেদিন থেকে পরবর্তী ৯ বছর ৯ মাস এবং ১৫ দিন হাচিকো  ট্রেন ষ্টেশনে আসার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ওখানে গিয়ে তার মালিক উনোকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করে আসছিলো।

 

হাচিকোর এই আচরণ সেখানকার সব কমিউনিটির মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলো। যারা সিবুয়া ষ্টেশনে নিয়মিত আসা যাওয়া করতেন তারা হাচিকো এবং প্রফসর উনোকে অনেক বার একত্রে দেখেছিলেন।

 

ষ্টেশনে যারা কাজ করতো শুরুর দিকে হাচিকোর প্রতি তাদের আচরণ তেমন বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। তবে দৃশ্যপট পাল্টে যায় যখন ১৯৩২ সালের ৪ অক্টোবর ‘আসানি সিম্বুন’ পত্রিকাতে হাচিকোকে নিয়ে প্রথম আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়।

 

লেখা প্রকাশিত হবার পর হাচিকোকে দেখতে প্রচুর লোকজন আসতে শুরু করে,যখন হাচিকো তার প্রভুর ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতো তখন তারা তাকে আদর দিত, খাবার দিত।

 

১৯৩২ সালে ইউনোর একজন ছাত্র হিরোকিছি সাটিও যিনি আকিতা জাতের কুকুর বিলুপ্তির হাত থেকে বাচাতে কাজ করছিলেন তিনি স্টেশনে কুকুরটিকে দেখতে পান। তিনি প্রফেসর ইউনোর সাবেক মালি কিকুযাবোরো কোবায়াছি বাড়িতে যান। এবং তার কাছ থেকে হাইচি’র জীবনের গল্প জানতে পারেন। তাদের দুজনের সে সাক্ষাতের পর সাবেক ছাত্র জাপানে আকিতা কুকুরদের শুমারি প্রকাশ করেন। তিনি গবেষণা করে দেখতে পান সে সময় সিবুয়া স্টেশনে থাকা হাইচি সহ জাপানে মাত্র ৩০ টি আকিতা জাতের কুকুর অবশিষ্ট ছিল।

 

সে (ছাত্র) এরপর থেকে অনেক বার হাইচিকে দেখার জন্য ষ্টেশনে গিয়েছিল। তিনি বছর জুড়ে কুকুরটির অবিস্মরণীয় বিশ্বস্ততা নিয়ে একাধিক আর্টিকেল প্রকাশ করেন। ১৯৩২ সালে সেসব লেখাগুলো প্রকাশিত হয় টোকিও আসাহি শিম্বুনে। এসব লেখা কুকুরটিকে পুরো জাপানে আলোচিত এক চরিত্রে পরিণত করে। প্রভুর প্রতি তার বিশ্বস্ততা জাপানে সবাইকে অভিভুত করে, সে সময় সব জাপানিজরা হাইচির কাছ থেকে পরিবারের প্রতি বিশস্ত থাকার এই শিক্ষাকে নিজেদের মধ্যে ধারন করার চেস্টা করছিলো। শিক্ষক এবং বাবা মায়েরা হাইচিকে শিশুদের জন্য উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসতো। সে সময়ের বিখ্যাত এক জাপানি ভাস্কর হাইচির একটি ভাস্কর্য গড়েন। আর আকিতা জাতের কুকুরদের বংশ রক্ষার জন্য ও সমগ্র জাপান গড়ে উঠে সচেতনতা। ক্রমে ক্রমে হাইচির কিংবদন্তিতুল্য বিশ্বস্ততা হয়ে উঠে বিশ্বস্ততার এক জাতীয় প্রতীক।

 

১৯৩৫ সালের ৮ই মার্চ হাইচি মারা যায়। তার মরদেহ সিবুয়ার পথে পাওয়া যায়। ২০১১ সালে বিজ্ঞানীরা হাইচির মারা যাবার কারন সম্পর্কে নিশ্চিত হন। তারা বলেন, হাইচি ক্যান্সার ও ফিকারিয়া ক্ষতে ভোগছিল। তার পাকস্থলীতে ৪ টি স্ক্রুও পাওয়া যায়। যদিও সেসব স্ক্রু তার পাকস্থলীর কোন ক্ষতি করেনি।

 

হাইচি মারা যাবার পর তাকে দাহ করা হয় এবং তার ভস্ম টোকিওর আওয়ামা কবরস্থানে সমাহিত করা হয় সাইচির প্রানের চেয়ে প্রিয় মালিক প্রফেসর ইউনোর করবের ঠিক পাশেই। হাইচির গায়ের লোম সংরক্ষণ করে হাইচির আকার দেয়া হয় এবং যা এখন জাপানের জাতীয় বিজ্ঞান যাদুগরে রক্ষিত আছে।

 

১৯৩৪ সালের এপ্রিলে সিবুয়া স্টেশনে একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি অবমুক্ত করা হয়। সে মূর্তিটি ছিল হাচিকোর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময় যদিও সে মূর্তিটি ধংস হয়ে যায়। তবে ১৯৪৮ সালে পুরাতন ভাস্কর্যের শিল্পীর ছেলে টাকেসি এন্ড আরেকটি ভাস্কর্য বানান। এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে নতুন ভাস্কর্যটি উদ্ভোধন করা হয়। এই জায়গাটি সেদিন থেকে একটি জনপ্রিয় জায়গায় পরিণত হয়। ভাস্কর্যের কাছে স্টেশনে প্রবেশ ও বাহিরে যাবার পথের নতুন নামকরন করা হয় ‘হাচিকো-গুচি’ নামে যার অর্থ ‘হাচিকো প্রবেশ ও বহির্গমন পথ ‘ যেটি সিবুয়া স্টেশনের পাচটি এক্সিটের একটি।

 

দ্যা জাপান টাইমস তাদের এপ্রিল ফুল আয়োজনে তার পাঠকদের জন্য একটি খবর প্রকাশ করেছিল। খবরটি ছিল এমন ‘সন্দেহ জনক মেটাল চোরেরা’ ২০০৭ সালের এপ্রিলের ১ তারিখ রাত ২ টার কিছু আগে হাচিকোর ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যটি চুরি করেছে। চুরির এই মিথ্যা রিপোর্টে চুরি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়। বলা হয় সে এলাকার নিরাত্তার দায়িত্তে থাকা লোকজনের গায়ে থাকা খাকি রংয়ের পোশাক পরা কিছু লোক চুরির এই কাজটি করে। রিপোর্টে এও বলা হয় যে, চুরির ঘটনা নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।

 

হাচিকোর নিজ শহর অডাটোর স্টেশনেও তার একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৪ সালে এই মূর্তিটি  ওডাতে অবস্থিত আকিতা কুকুর যাদুগরের সামনে স্থাপন করা হয়।

হাচিকো স্টেশনের ঠিক যে জায়গাতে বসে অপেক্ষা করতো সে জায়গাতে ব্রোঙ্গের থাবা একে দেয়া হয়েছে এবং একই সাথে জাপানী ভাষায় তার বিশ্বস্ততার কথা লিখে দেয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে হাচিকোকে নিয়ে ‘Hachi: A Dog’s Tale’ নামে একটি সিনেমা বানানো হয়।

 

সিনেমাটি চিত্রায়িত করা হয় ‘বেড্রিজ’ রেল স্টেশনে। প্রতি বছর এপ্রিলের ৮ তারিখে হাচিকোর ত্যাগকে সম্মান দেখিয়ে টোকিওর সিবুয়া রেল স্টেশনে স্মরণ অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তার বিশ্বস্ততার প্রতি সম্মান দেখিয়ে শত শত কুকুর প্রেমী স্টেশনে ভিড় করেন। ১৯৯৪ সালে জাপানের নিপ্পন সাংস্কুতিক সম্প্রচার একটি পুরনো রেকর্ড থেকে হাচিকোর ঘেউ ঘেউ শব্দ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তার ডাক সম্প্রচারে বিশাল আকারে প্রচারনা চালনা হয়।  হাচিকোর মারা যাবার ৫৯ বছর পর ১৯৯৪ সালের ২৮ এপ্রিল লক্ষ লক্ষ মানুষ হাচিকোর ডাক শুনেছিল। ২০১২ সালে হাচিকোর দুর্লভ সব ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ২০১৫ সালে প্রথম বারের মত হাচিকোর একটি ছবি প্রকাশ করা হয় যে ছবিটি ১৯৩৪ সালে টোকিও ব্যাঙ্কের একজন কর্মচারী ধারন করেন। ছবিটিতে দেখা যায় হাচিকো সিবুয়া রেল স্টেশনে বসে আছে। ২০১৫ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ফ্যালাল্টি একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি গড়ে যেখানে দেখা যায় পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া ইউনো হাচিকোর সাথে দেখা করতে ফিরে আসছেন।

 

হাচিকোকে নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি দেখে খুব শক্ত মনের মানুষের পক্ষেও চোখের জল ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পরে। সিনেমা রিভিউ সাইট আইএমডি তে একজন দর্শক লিখেছেন ‘সিনেমা শেষে এত লোককে কাদতে আমি কখনোই দেখিনি, এটা সত্যিই এক দুঃখজনক গল্প …’

 

হাচিকোকে নিয়ে সিনেমাঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Hachi:_A_Dog’s_Tale

হাচিকোকে নিয়ে বই ঃhttp://www.amazon.com/Hachiko-The-True-Story-Loyal/dp/0547237553

হাচিকোকে নিয়ে ইউটিউব ভিডিওঃ https://www.youtube.com/watch?v=fJxgu8TtIWI

 

তথ্যসুত্রঃ

১। https://en.wikipedia.org/wiki/Hachik%C5%8D

২। http://www.imdb.com/title/tt1028532/

৩। https://www.thedodo.com/rare-photo-of-loyal-dog-hachiko-1446468544.html

৪। http://www.hachiko.me/

Comments

comments